অদৃশ্য আঙ্গুলের ইশারায় শ্রমিকদের আন্দোলন

অদৃশ্য আঙ্গুলের ইশারায় শ্রমিকদের আন্দোলন

কোন দিকে যাচ্ছে পোশাক খাত? সরকার মজুরি কাঠামো সংশোধন করার আশ্বাস দিলেও থামছে না শ্রমিকদের আন্দোলন। গত ৭ দিনের টানা আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। সড়ক অবরোধ করে ভাঙচুর করা হয়েছে বেশ কিছু যানবাহন। এসব ঘটনায় শ্রমিকদের নামে মামলাও হয়েছে। কেউ কেউ বলছে, অদৃশ্য আঙ্গুলের ইশারায় চলছে শ্রমিকদের আন্দোলন। তৃতীয় কোনো শক্তি পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে। তারা পেছন থেকে শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছে। আবার শ্রমিকদের অসন্তোষের পেছনে কেউ কেউ মালিকপক্ষদের দায়ী করছেন।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, শ্রমিকের মজুরি নিয়ে পুরনো পথে হেঁটেছেন পোশাকশিল্পের মালিকেরা। তারা বাড়িভাড়া, যাতায়াত, খাদ্য ও চিকিৎসা ভাতা বাড়িয়ে দিলেও মূল মজুরি বা বেসিক বাড়াতে কৃপণতা করেছেন। গত পাঁচ বছরে শ্রমিকের মূল মজুরি ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধির বিষয়টিও আমলে নেয়া হয়নি। ফলে নতুন শ্রমিকের মোট মজুরি বা সর্বনিম্ন গ্রেডে ২ হাজার ৭০০ টাকা বৃদ্ধি পেলেও দক্ষ বা পুরনোদের তার অর্ধেকও বাড়েনি। মজুরি কাঠামোর এই কৌশলের জন্যই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন শ্রমিকরা।

তবে মজুরি নিয়ে মালিকপক্ষ কোনো কৌশল করেননি বলে দাবি করেছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির। তিনি বলেন, আগের দু’বারের নিয়ম মেনেই এবারের মজুরি কাঠামো করা হয়েছে। কারো মজুরি কমেনি। তবে হয়তো শ্রমিকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী মজুরি বৃদ্ধি পায়নি। মজুরি কাঠামোতে কোনো সমস্যা আছে কিনা, সেটি খুঁজে বের করার জন্য ত্রিপক্ষীয় কমিটি হয়েছে। তার পরও শ্রমিকদের ধৈর্য না ধরা দুঃখজনক।

২৫ নভেম্বর পোশাকশিল্পের জন্য নতুন মজুরি কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করে শ্রম মন্ত্রণালয়। তাতে নিম্নতম মজুরি ৮ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়। চলতি মাস থেকে নতুন কাঠামো মেনে বাড়তি মজুরি পেতে শুরু করেন শ্রমিকরা। তার আগে নিম্নতম মজুরি ছিল ৫ হাজার ৩০০ টাকা।

কয়েক শ্রমিক নেতা জানান, ওপরের গ্রেডে মূল মজুরি বৃদ্ধি না পাওয়ায় শ্রমিকদের ওভারটাইমের অর্থ বাড়বে না। এমনকি উত্সব ভাতাও বাড়বে না। সব দিক দিয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দক্ষ শ্রমিকরা।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একটি কারখানায় কয়েক বছর ধরে কাজ করেন শ্রমিক বাবু মিয়া। তিনি বলেন, নতুন কাঠামোতে তিনি যে বেতন পাবেন, তার চেয়ে মাত্র ৪০০ টাকা কম পাবেন সদ্য যোগ দেয়া (হেলপার) শ্রমিকটি। তাহলে পার্থক্যটা থাকল কী?’

আরেক শ্রমিক পারভীন আক্তার বলেন, ‘বেতন বাড়াইছে হুইনাই তো বাড়িওয়ালা হা কইরে রইছে, কহন ভাড়া বাড়াইব। এহন সব খরছই তো বাড়ব। কিন্তু হিসাব কইরা দেহি ট্যাহা তো বাড়ে না।’ পাশে দাঁড়ানো কয়েক পুরুষ সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘ও ভাই তুমরা কওতো কত কইরে বাড়ছে তোমাগো।’ শ্রমিকরা উচ্চ স্বরে বলেন, মজুরি তেমন বাড়েনি।

এদিকে শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার সানা শামীনুর রহমান বলেন, নতুন বেতনকাঠামোতে গ্রেড অনুযায়ী যে বেতন বেড়েছে, সে সম্পর্কে শ্রমিকদের ভালো ধারণা নেই। সে কারণেই ভুল-বোঝাবুঝি থেকে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, গতবারের মজুরিকাঠামো কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে মূল মজুরি বেড়েছে। বিষয়টি নিম্নতম মজুরি বোর্ডে দর-কষাকষির সময় একেবারেই অনুপস্থিত রাখা হয়। ফলে ওপরের গ্রেডের মজুরি তেমন বাড়েনি। আবার ওপরের ও নিচের গ্রেডের মজুরি পার্থক্য আগের চেয়ে কমে গেছে। এখন সহজ সমাধান হচ্ছে, গত পাঁচ বছরে শ্রমিকদের মূল মজুরি যেটুকু বেড়েছে, তা নতুন কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে মজুরি দেয়া।

গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নতুন মজুরি কাঠামোতে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামেন নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বেশ কিছু কারখানার শ্রমিকরা। বিজিএমইএ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের চেষ্টায় নির্বাচনের আগে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়। তবে গত রোববার ঢাকার উত্তরার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। পরের দিনগুলোতে তা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। গত মঙ্গলবার সংঘর্ষের সময় নিহত হন সাভারের উলাইলের আনলিমা টেক্সটাইলের শ্রমিক সুমন মিয়া। শ্রমিক অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে আশুলিয়া ও সাভার এলাকায় চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরিস্থিতি খারাপ হলে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানা গেছে।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবারও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে পোশাক শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রায় অর্ধশত পোশাক শ্রমিক আহত হয়েছেন।

গতকাল সকালে রাজধানীর কালশী রোডে স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসের সামনে অবস্থান নেন শ্রমিকেরা। এ সময় তারা সড়কের ওপর বসে পড়েন। স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসসহ আশপাশের কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন। এতে কালশী রোড ও আশপাশের সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে যান চলাচল করতে থাকে। নিরাপত্তার জন্য স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসের সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যসহ জলকামান, সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের মালিক মোশাররফ হোসেন ঘটনাস্থলে আসেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের সহায়তায় ঘণ্টাখানেক তার সঙ্গে শ্রমিকদের আলোচনা হয়। সকাল পৌনে ১০টার দিকে শ্রমিকরা ১২ জানুয়ারি শনিবার থেকে কাজে যোগ দেয়ার ঘোষণা দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।

পল্লবী থানার পরিদর্শক (অপারেশন) ইমরানুল হাসান বলেন, নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী বেতন-ভাতাসহ অন্য সুবিধা নিশ্চিত করার আশ্বাসে পর শ্রমিকেরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন। অবরোধ তুলে নেয়ার পর কালশী রোডে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আমাদের সাভার প্রতিনিধি জানান, সরকার ঘোষিত মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণ, বাস্তবায়ন ও বেতন বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে ৫ম দিনের মতো গতকাল বৃহস্পতিবারও আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে এবং সড়ক অবরোধ করেছে শ্রমিকরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশ ও শ্রমিকসহ আহত হয়েছে অন্তত ৪০ জন।

গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের আশুলিয়ার বেরন এলাকায় ও জিরাবো-কাঠগড়া-বিশমাইল সড়কের পার্শ্ববর্তী প্রায় অর্ধশত পোশাক কারখানার শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

শ্রমিকরা জানান, সরকার ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়ন ও গ্রেড অনুযায়ী বেতন বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে তারা ৫ম দিনের মতো একটানা আন্দোলন করছেন। তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে তারা কারখানার উত্পাদন বন্ধ রেখে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন। মূলত তারা উপায়ান্তর না পেয়েই এ পথ বেছে নিয়েছেন। বাজারের ঊর্ধ্বগতি, বাড়ির মালিকদের ভাড়া বৃদ্ধি, তাদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বৃদ্ধির কারণে সরকারের ঘোষিত মজুরি কাঠামো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। যে মজুরি কাঠামো ঘোষণা হয়েছে সেখানে গ্রেড অনুযায়ী তা বৃদ্ধি পায়নি। তাছাড়া ওভারটাইম, চিকিত্সা ও বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি। আর তাদের মজুরি বৃদ্ধি শুধু আন্দোলনের মাধ্যমেই তারা বিগত দিনে আদায় করেছেন বলেও তারা জানান।

পুলিশ জানায়, সকালে বেরন এলাকার শারমিন গ্রুপের এএম ডিজাইন কারখানার শ্রমিকরা উত্পাদন বন্ধ রেখে কারখানা থেকে সড়কে বেরিয়ে আসেন। এ সময় শ্রমিকরা সামনের সড়কে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। পুলিশ এতে বাধা দিলে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ওই কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দেয় পার্শ্ববর্তী স্টার্লিং অ্যাপারেলস, উইন্ডি গ্রুপ, সেতারা গ্রুপ, ডিজাইনার জিন্সসহ প্রায় ১০-১৫টি পোশাক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দফায় দফায় টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ ঘটনায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও পুলিশসহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়। পরে বিজিবি ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রায় ১ ঘণ্টা পর আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।

এদিকে, সকাল সোয়া ৮টায় ও বেলা পৌনে ১১টায় আশুলিয়ার জিরাবো-কাঠগড়া-বিশমাইল সড়কের পার্শ্ববর্তী প্রায় ৩০টি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা তারা কারখানার উত্পাদন বন্ধ রেখে তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাস্তায় নেমে ওই সড়কের যানবাহন চলাচলে বাধা দেয় এবং সড়ক অবরোধ করে গাছের গুঁড়ি ফেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

পুলিশ শ্রমিকদের হঠাতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে তারা পৃথক পৃথক স্থানে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়। পাশাপাশি শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ওই সড়কে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা কোনো পরিবহন চলাচল করতে পারেনি। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ অপেক্ষমান ও পরিবহনে আরোহিত যাত্রীরা।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন জানান, শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় আশুলিয়ার জিরাবো-কাঠগড়া ও জামগড়াসহ বেশ কিছু এলাকার প্রায় অর্ধশত পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরা তাদের গাড়ি নিয়ে ঢাকা-আরিচা ও জিরাবো-কাঠগড়া-বিশমাইল এবং আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কে টহল দিচ্ছেন। শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে আশুলিয়ার অধিকাংশ পোশাক কারখানার সামনে দুই দিনের বন্ধের নোটিশ সাঁটিয়ে দিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.