অতিরিক্ত মেহগনি রোপণের ভয়ঙ্কর পরিণতি

ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা আজ হারাতে বসেছে তার গৌরব। কেনো এ দুর্যোগের ঘনঘটা? বাংলাদেশ যেন মা বসুন্ধরার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে বৈশ্বিক উষ্ণতার পথে। উত্তরবঙ্গ যেমন হয়ে পড়েছে ইউক্যালিপটাসময়। তেমনি দক্ষিণবঙ্গ ও পিছিয়ে নেই। সেখানের মাটি হয়েছে মেহগনির ঘাটি। এতো গাছ থাকার পরেও কেনো প্রকৃতি ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু?

প্রকৃতির ভালোর জন্য দশটি প্রধান কাজের একটি হলো গাছ লাগানো। সবাই জানি গাছ অনেক উপকারী। অক্সিজেন দেয়, পানি সংরক্ষণ করে, পশু পাখির বাসস্থান ও খাদ্যের ব্যবস্থা করে, ইত্যাদি। কিন্তু সঠিক ভাবে গাছ লাগানোটা আমরা কয়জন জানি?

সব গাছ সমান নয়, কিছু গাছ স্বাভাবিকভাবে প্রকৃতির উপকার সাধন করে এবং কিছু গাছ উপকারের বদলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশের ক্ষতিসাধন করে। মেহগনি তার মধ্যে অন্যতম। কারণ এটা দেশীয় প্রজাতির গাছকে জন্মানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। ধীরে ধীরে সেগুলো বিলুপ্তির পথে পা বাড়ায়।

ফলদ বাংলাদেশ তাদের কার্যক্রম চালিয়েছিলো দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলায়। আমি ফলদ বাংলাদেশের কার্যক্রমে সঙ্গী হয়েছিলাম।   অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, দক্ষিণবঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত হারে চোখে পড়েছে মেহগনির গাছ। প্রথম প্রথম রাস্তার দুধারের মেহগনি দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু, কিছুক্ষণ পর নির্মম সত্যটা উপলব্ধি করা গেলো। কোনো পাখির কলরব নেই, বাস্তুসংস্থানের দিক থেকেও মাটিকে অনুর্বর করার ফলে এর কার্যকারিতা খুবই কম। এ প্রসঙ্গে ফিলিপাইনের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। গবেষক বলেছেন, “মেহগনি মাটিকে নিজের মত করে নিয়ে বেড়ে উঠে, পাতার ক্ষতিকারক রস মাটিকে অনুর্বর করে তোলে, কোনো কীটপতঙ্গ বাঁচতে পারে না।”

প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরের সূত্রে জানা যায়, মংলার সৈয়দ আবদুল মমিন কোনো রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে মেহগনির বীজ থেকে তৈরি তেল দিয়ে পোকামাকড় দমন করেন। উকুন মারার ঔষধ, কীটনাশক যা দিয়ে তৈরি হয় সেই জিনিস সারা দেশের সব মাটিতে বিছিয়ে দিলে কি হতে পারে অন্যান্য উপকারী অণুজীবের অবস্থা?

শুধু মেহগনি নয়, অতিরিক্ত বিদেশি গাছ যেমন ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি ইত্যাদি রোপণের ফলে পরিবেশ আজ হুমকির সম্মুখীন। সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, “এতদিন বিদেশী দাতা সংস্থার পরামর্শে সামাজিক বনায়নের নামে এ ধরণের গাছ লাগানো হয়েছে। এ গাছগুলোর নিচে অন্য কোনো গাছ হয় না, এমনকি পাখিও বসে না। আকাশমণি ফুলের রেণু নিশ্বাসের সংগে শরীরে গেলে এজমা হয়।” তিনি দেশী প্রজাতির গাছ রোপণের মাধ্যমে বনায়ন করতে বলেছেন। সামাজিক বনায়ন হিসেবে কাঁঠাল, জাম, তাল ও খেজুর গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মকবুল হোসেন বলেন, “প্রকৃতির অন্যতম বান্ধব হলো বন। আর বনায়নের জন্য থাকা চাই জাতীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালা।” তিনি বলেন সেগুন, ইউক্যালিপটাস, মেহগনি এসব গাছ সব জায়গায় রোপণ করা উচিৎ নয়।

ফলদ বাংলাদেশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করে উত্তরাঞ্চলে ইউক্যালিপটাস এবং দক্ষিণাঞ্চলে মেহগনি গাছের আধিক্য প্রবলভাবে লক্ষ্য করেছে। এছাড়াও ফলদ বাংলাদেশ দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ জেলায় বৃৃক্ষ মানচিত্র পর্যবেক্ষণ করেছে। দেখা গেছে, শুধু রোপিত বৃক্ষ নয়, বন বিভাগসহ সকল নার্সারির অধিকাংশ চারা মেহগনির, যারা অদূর ভবিষ্যতে রোপিত হবে।
এই সমস্যার আশানুরূপ সমাধানের লক্ষ্যে ফলদ বাংলাদেশ জাতীয় সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই, গণসচেতনতা গড়ে তুলি। আর তা না হলে আমাদের দেশীয় প্রজাতির গাছগুলি হারিয়ে যাবে চিরতরে, মাটি হয়ে পড়বে অনুর্বর, পরিবেশ হয়ে যাবে বসবাসের অনুপযোগী।

লেখক : মোঃখোশনূর আলম
সমাজকর্মী

শিক্ষার্থী-জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

***
মানবকণ্ঠ/আরএস