অক্টোবরে স্পষ্ট হবে জোটের সমীকরণ

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আরো কিছু ছোট দলকে কাছে টানার চেষ্টা করছে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। উভয় দলই শরিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে ঐক্য সংহত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ছোট দলগুলোর নেতাদের বাসা কিংবা অফিসে বৈঠক করছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা।

জোট সম্প্রসারণ উদ্যোগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে বেশ এগিয়ে গেছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগে নেতাদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। অন্যদিকে এখনো থমকে আছে বিএনপির বৃহত্তর জোট গঠনের প্রক্রিয়া। জোট সম্প্রসারণে দলটির তৎপরতায় এখনো নেই কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি। এতদিন বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনে প্রধান বাধা ছিল জোটের অন্যতম শরিক একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী।

এখন খোদ বিএনপিকেই পছন্দ করছে না কোনো কোনো দল। বিএনপি শাসনামলের দুর্নীতি, দুঃশাসন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ও জঙ্গিবাদী তৎপরতাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার বিষয়টিকে এখন সামনে আনতে শুরু করেছেন উদারপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা।

ফলে জামায়াতের পাশাপাশি বিএনপির অতীত কর্মকাণ্ডও এখন বৃহত্তর জোট গঠনের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, অবশেষে জোটের সমীকরণ কি হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বাকি আর মাত্র দুই মাস। সংবিধান অনুযায়ী আগামী অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে সংসদ নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে অক্টোবরেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে জোটের সমীকরণ।

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব¡াধীন ১৪ দলীয় জোট আরো বড় হতে পারে। অনেকেই জোটে আসতে চাইছে। অনেকেই আবার নিজেরাই আলাদা জোটে ঢুকতে চাইছে। বিএনপির সঙ্গেও থাকবে না, আওয়ামী লীগের সঙ্গেও নয়।

এমন জোটেও হতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এটা পরিষ্কার হবে অক্টোবরে। অন্যদিকে জোট সম্প্রসারণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্র, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি জানান, কয়েকটি দল ১৪ দলে আসতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।

এদিকে কোনো ধরনের পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই ২৪ জুলাই বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পাটির (সিপিবি) অফিসে যান আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সেখানে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে নির্বাচন ও জোট নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেন তিনি। আওয়ামী লীগ বলছে, সিপিবি আগামী একাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট না বাঁধলেও নির্বাচনে অংশ নেবে। ২৬ জুলাই কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বৈঠক করেন বিএনএ জোটের প্রধান সাবেক বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার সঙ্গে। বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের সঙ্গেও বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি ফোনে কথা বলেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের সঙ্গে।

এদিকে ৬ আগস্ট নিরপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জাতীয় ঐক্য তৈরি করার সুযোগ করে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা খফরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ২০ দলীয় জোটের বাইরে আমরা সরকারবিরোধী অন্য দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছি। অনেকে সাড়াও দিয়েছে। কেউ কেউ ভিন্ন প্লাটফর্ম থেকে তাদের যৌক্তিক দাবির পক্ষে মাঠে থাকবে বলে জানিয়েছে। গণদাবিতে তারা একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চান।

তিনি বলেন, ক্ষমতায় যাওয়াই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। এ জন্য বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে।

যুক্তফ্রন্টের শরিক বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে বিএনপি। যুক্তফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে বাসা কিংবা অফিসে গিয়ে বৈঠক করছেন বিএনপি মহাসচিব। এই জোটে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগকেও টানার চেষ্টা চলছে। নবগঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করছে বিএনপি। তবে আলোচনা বেশি দূর এগোয়নি।

এ ব্যাপারে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে এককভাবে আন্দোলন করে জয়লাভ করা সম্ভব নয়। এ জন্য সব দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য দরকার। এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই।’ তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনের ব্যাপারে দলগতভাবে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।

এদিকে বৃহত্তর ঐক্য গঠন বিষয়ে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, সরকারের প্রতি ষোলো আনা অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সেটা থেকে আগে মুক্ত হতে হবে। এ সরকার বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করলেও আচরণ অতীতের স্বৈরাচারী সরকারে মতো। বর্তমান সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই আন্দোলনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি আদায় করতে হবে। এ কারণে স্বৈরাচারবিরোধী বৃহত্তর জাতীয় জাতীয় ঐক্য গঠনের ডাক দিয়েছি। তিনি বলেন, এটা মূলত জনগণের ঐক্য। নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে অন্য গণতান্ত্রিক দলগুলো একমত হলে তারাও আন্দোলনে যোগ দেবে। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ কখনো নিরপেক্ষ আন্দোলনকে ভয় পায়নি। অথচ এখন নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে বৃহত্তর ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

তিনি আরো বলেন, ‘যারা জনগণের কথা না ভেবে, পেশিশক্তি এবং সাম্প্রদায়িকতার ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি করে তাদের জাতীয় ঐক্য থেকে বাদ দেয়া উচিত। যারা জনগণের কথা চিন্তা করে রাজনীতি করে, তারা জনগণকে সামনে নিয়েই এগিয়ে যেতে পারবে।’ গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন সরকারের ওপর থেকে শতভাগ আস্থা হারালেও এখনো হতাশ হননি দলের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে নীতি আদর্শের রাজনীতি করতে চাই। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ কখনো দ্বিমত করে না। কিন্তু কার্যত তারা উল্টোটা করে। এখানেই আমাদের দুঃখ। তবে আওয়ামী লীগ আমাদের শর্তসমূহ মেনে নিলে তাদের সঙ্গেও ঐক্য হতে পারে।

অন্যদিকে বিএনপির নাম উল্লেখ না করে যুক্তফ্রন্টের মুখপাত্র ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমাদের জাতীয় ঐক্য একজনকে বদলিয়ে আরেকজনকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়। কাউকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য আমাদের ঐক্য নয়। দেশকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচাতে আমরা ঐক্য করতে চাই। তিনি বলেন, আমাদের এই ঐক্যের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা আগে ক্ষমতায় ছিলেন। বর্তমান সরকার ক্রসফায়ার দিচ্ছে, তারা অপারেশন ক্লিন হার্ট দিয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা যেভাবে লোকজন ধরে নিয়ে গেছে, তারাও এভাবে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এরা যেমন দুর্নীতি করছে, তারাও করেছিল। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে কেউ বেশি আর কেউ একটু কম। তবে তাদের চরিত্র একই। তাই আমাদের ঐক্য কাউকে বদলে আবার অন্য কাউকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়।

আর বিকল্পধারা বাংলাদেশের যুগ্ম-মহাসচিব মাহী বি চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপিসহ সব দলের জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। তবে বিএনপি বা অন্য কোনো দল যেন এককভাবে সরকার গঠন করতে না পারে, সেটাও আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি যখন ১৫০ আসনের প্রস্তাব দিয়েছি, সবাই আমাকে নিয়ে সমালোচনা করেছে। আমাদের নাকি ১৫০ আসনে প্রার্থী দেয়ার মতো লোক নেই। আমি বলতে চাই বিএনপি বড় দল, তাদের মার্কা আছে। কিন্তু বিএনপির প্রার্থীদের চেয়ে আমাদের প্রার্থীরা অনেক বেশি যোগ্য। আমাদের শুধু শক্ত মার্কাটাই নেই। তাই আমরা দেশের ভালোর জন্য বিএনপির মার্কা আর আমাদের প্রার্থীদের একসঙ্গে করার প্রস্তাব দিয়েছি। বিএনপি যদি এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা করে, তাহলে কিন্তু জাতীয় ঐক্য সম্ভব হবে না।

মানবকণ্ঠ/এএএম