অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, সেজন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন নিউইয়র্ক সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিষয়কমন্ত্রী জেরেমি হান্ট নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন।
পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক জানান, জাতিসংঘ সদও দফতরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক কক্ষে জেরেমি হান্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠক হয়। আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে বলতে গিয়ে জেরেমি হান্ট বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করি।’ জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’ ব্রিটিশ মন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠকে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে সমস্যাটা কোথায়, তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান জেরেমি হান্ট। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চুক্তি হওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেন, চুক্তি করলেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’
মিয়ানমারে গণহত্যা চলছে বলে অভিযোগ আছে, এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া উচিত হবে কিনা-তা জানতে চান জেরেমি হান্ট। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারলে তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে।’ রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরে অস্থায়ী আবাসস্থল নির্মাণের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যসহ অন্য দেশের সহযোগিতা কামনা করেন।
শিক্ষায় বেসরকারি বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষা খাতের উন্নয়নে মুনাফার মানসিকতা বর্জন করে অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সোমবার বিকেলে জাতিসংঘের সদও দফতরে শিক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সুবিধা নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের এক আলোচনায় তিনি এ আহ্বান জানান। জাতিসংঘের শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘সনাতনী সহায়তা শিক্ষায় অর্থায়নের ঘাটতি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের অবশ্যই বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মুনাফার মানসিকতা ছেড়ে শিক্ষাকে জনসাধারণের নাগালে নেয়ার জন্য বেসরকারি খাত থেকে বিনিয়োগ আসা উচিত। কারণ শ্রমিকরা মানসম্পন্ন শিক্ষা পেলে তাদের ব্যবসাই সমৃদ্ধ হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের শিক্ষার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঋণ না দিয়ে বরং বেশি বেশি অনুদান দেয়ার মাধ্যমে বিশাল এই ব্যয়ের বোঝা বহনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে।’
এসডিজি ফোরের লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষা খাতে ব্যাপকভাবে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশীয় উৎস থেকে প্রাক্কলিত তহবিল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও অর্থায়নে বড় ধরনের ফাঁক থেকে যাবে। উদ্ভাবনী অর্থায়ন পদ্ধতি খুঁজে বের করতে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা-২০৩০-এর ‘গোল ফোর’ অর্জনে সাফল্যের চাবিকাঠি হলোÑ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে সম্পদ প্রবাহ বাড়িয়ে সামঞ্জস্য আনা।’
টেকসই শান্তি নিশ্চিতে শিক্ষাকে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজšে§র নিরাপদ শান্তির জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষা উচ্চাকাক্সক্ষা বাড়ায়, নিজের অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং জীবনকে সমৃদ্ধ করে। আর সামাজিক ব্যাধির বেশিরভাগই দূর করে সুশিক্ষা। এটি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে, আয় ও দারিদ্র্য নিরসনে ভূমিকা রাখে।’ ২০১৫ সালে ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডায় সবার জন্য সমান গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে বিশ্বের প্রায় ২৬ কোটি ৩০ লাখ শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৮০ কোটি শিশুর মৌলিক দক্ষতার অভাব হবে। এটি বিপজ্জনক।’ শিক্ষা ক্ষেত্রে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিক্ষা খাতের জন্য ৮৬ হাজার ৭২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।’
রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য মিয়ানমারেও বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর: রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যা ও নির্যাতনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার পর রোহিঙ্গা শিশুরা যাতে আগের মতো শিক্ষাসহ অন্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না থাকে সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমারে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের সদর দফতরে সোমবার ‘ইনভেস্টমেন্ট ফর এডুকেশন অব উইমেন অ্যান্ড গার্ল’ শীর্ষক এক আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনি এ আহ্বান জানান।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে সেজন্য ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি মিয়ানমারে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি, যেন এই শিশুরা সেখানে ফিরে যাওয়ার পরে শিক্ষাসহ সব অধিকার পায়।’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্র–ডোর উদ্যোগে আয়োজিত এই গোলটেবিল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ৩টি প্রস্তাব দেন। প্রথমত, সংঘাত, জাতিগত নিধন এবং গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা শিশুদের মানসিক আঘাত লাঘবে এবং সামাজিক প্রয়োজন মেটাতে নজর দেয়া। দ্বিতীয়ত, সংঘাত ও জাতিগত নিধন থেকে পালিয়ে আসা শিশুরা সাধারণ স্কুলে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যায় পড়তে পারে। তাই তাদের জন্য অনানুষ্ঠানিক এবং দৈনন্দিন জীবনের দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শিশুরা এখন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে বসবাস করছে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, জাতিসত্তা এবং ভাষা অনুযায়ী এই শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের শিক্ষা তাদের আসল পরিচয় রক্ষায় সহায়ক হবে। নিজের দেশে ফেরার জন্য তারা নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে।
সব বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর: বিশ্ব শান্তির জন্য বিশ্ব নেতাদের সব বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘শান্তি এখনো অধরা, তাই সব পরিস্থিতিতে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে হবে।’ জাতিসংঘের সদর দফতরে সোমবার নেলসন ম্যান্ডেলা শান্তি সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা বাড়াতে হবে, সহনশীলতাকে উৎসাহিত করতে হবে। বৈষম্য ও শোষণ থেকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে হবে।’ সন্ত্রাসবাদের মতো বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় সন্ত্রাসীদের অর্থ ও অস্ত্রের সরবরাহ বন্ধের জন্য বিশ্ব নেতাদের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন। যে কোনো পরিস্থিতিতে মানবাধিকার উন্নয়নে ও সুরক্ষার জন্য শান্তি ও অহিংসার সংস্কৃতির চর্চা করুন। তবুও শান্তি এখনো অধরা, দ্বন্দ্ব সমাধান থেকে অনেক দূরে।’ তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার জন্য ম্যান্ডেলার মতো নেতারা লড়াই করেছিলেন, তা এখনো সুরক্ষিত নয়। বিশ্বের অনেক অংশে মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে। বর্ণবাদ এবং অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক সমাজের মানুষ বৈষম্য, জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি, অত্যাচার, এমনকি জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে গণহত্যার শিকার হচ্ছে।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী জাতিগত নির্মূলের শিকার হওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।