শিরোনাম :
চট্টগ্রাম বন্দরের অন্দরে
Published : Thursday, 12 January, 2017 at 12:00 AM
মফিজুল ইসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দরের অন্দরেদেশের অর্থনীতির সূতিকাগার বলা হয় চট্টগ্রাম বন্দরকে। নানা অব্যবস্থাপনার কারণে অনেকটা হুমকির মুখে চট্টগ্রাম বন্দর। এ বন্দরকে ঘিরে প্রতিদিন নানা সংবাদের সৃষ্টি হলেও অনেকটা অপ্রকাশিতই থেকে গেছে এ বন্দরের অন্দরের খবর। নেপথ্যে কি কি অব্যবস্থাপনা রয়েছে তা নিয়ে রয়েছে সংশয় ও ধোঁয়াশা। সম্প্রতি বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বন্দরের অন্দরে। গত এক সপ্তাহ ধরে বন্দরের জাহাজজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখানেই প্রতিদিন হচ্ছে কন্টেইনার থেকে মালামাল চুরি। বন্দরের সৃষ্টির পর থেকে এখনো রয়েছে অরক্ষিত। যন্ত্রপাতি সংকট তো রয়েছেই। এ ছাড়াও রয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন। তিন গ্রুপে বিভক্ত বন্দরের অন্দরের শ্রমিক রাজনীতি। তবে গত এক বছরের বন্দরের সফলতা বলতে রয়েছে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে সর্বোচ্চ কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং। এ সফলতার নেপথ্যে রয়েছে বন্দরের অভ্যন্তরে প্রতিষ্ঠিত নতুন নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এনসিটির কর্মদক্ষতা ও কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারই এ সফলতা এনে দিয়েছে।
অরক্ষিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা: চট্টগ্রাম বন্দরের বয়স ১৩০ বছর চলছে। প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের জš§দিন পালন করা হয়। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বন্দরের কারণে দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। উপমহাদেশের প্রাচীনতম এ বন্দর ১২৯ বছর পার করলেও এখনো রয়েছে হুমকির মুখে। প্রায় সময় বন্দরের অভ্যন্তরে ঘটছে নানা ঘটনা। এমনকি কন্টেইনারের মধ্যে মানুষ ঢুকে দেশ পাড়ি দেয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। বন্দরের বাউন্ডারির অনেক জায়গায় রয়েছে নির্বিঘেœ ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ। এ ছাড়াও বন্দরের বাইরে ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে চ্যানেলে এখনো ডুবে আছে অনেক জাহাজ। গত ৮ বছরে ২৫টিরও বেশি লাইটারেজ জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে। এগুলো চ্যানেলের আশপাশে তলিয়ে আছে। এসব কারণে প্রায় সময় ঘটছে জাহাজ দুর্ঘটনা। বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ নিমজ্জিত জাহাজগুলো তোলা না হলে জাহাজ দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
প্রকট আকার ধারণ করেছে জাহাজজট: সম্প্রতি কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং-এ চট্টগ্রাম বন্দরের সফলতা আসলেও বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজজট লেগেই আছে। গত এক মাস ধরে প্রতিদিন চট্টগ্রাম বন্দরে শতাধিক জাহাজ আটকে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজজটের নেপথ্যে রয়েছে নানা অব্যস্থাপনা, কাস্টমসের ছাড়পত্র নিয়ে বিলম্ব, টার্মিনাল ব্যবহার নিয়ে শ্রমিকদের পক্ষে-বিপক্ষে রাজনীতি, বন্দরের অভ্যন্তরে ২য় দফায় রেডিয়েশন ডিটেক্টরের মাধ্যমে পণ্য পরীক্ষায় বিলম্ব, জেটিতে ভেড়ানোর জন্য জাহাজের অনুমোদিত গভীরতা নিয়ে নানা জটিলতার কারণেও জাহাজজট হয়ে থাকে বলে অভিযোগ করেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।
যন্ত্রপাতি সংকট: চট্টগ্রাম বন্দরে একসঙ্গে ১৫টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা যায় বলে বন্দর সূত্রে জানা যায়। কিন্তু বাস্তবপক্ষে যন্ত্রপাতির অভাবে বর্তমানে একসঙ্গে ১৫টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ কন্টেইনারবাহী ক্রেন পর্যাপ্ত নেই। এগুলোর কয়েকটি বিকল হওয়ায় মেরামতের কাজও চলছে। কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রধান যন্ত্র ‘কি গ্যান্ট্রি ক্রেন’ পর্যাপ্ত না থাকায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে। এর ফলেও অনেক সময় জাহাজজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও কন্টেইনার হ্যান্ডলিংও বিলম্ব হয়। এ সমস্যা অচিরেই সমাধান না হলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজজটের পাশাপাশি কন্টেইনার জটও সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিনিয়তই হচ্ছে মালামাল চুরি: চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে ও বাইরে নিরাপত্তা বেষ্টনী অরক্ষিত থাকায় প্রায় সময় কন্টেইনার থেকে মালামাল চুরি হচ্ছে। বন্দর ব্যবহারকারীরা প্রায় সময় এমন অভিযোগ তুলছেন। বিশেষ করে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস হয়ে বন্দরের রক্ষিত কান্টেইনারের মুখ খুলে বন্দরের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কন্টেইনার থেকে প্রতিদিন মালামাল চুরি করছে। কন্টেইনারের বৃহৎ পণ্যে অল্প পরিমাণ পণ্য চুরির ঘটনায় অনেকে নীরব থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল আনয়নকারীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এ ছাড়া এসব পণ্য যারা চুরি করে তারা আবার এসব পণ্য বিভিন্ন মার্কেটে বিক্রি করছে। এ রকম কয়েক কাপড় ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, তারা বন্দর থেকে কন্টেইনারবাহী পণ্য খালাস করে মার্কেটে দেয়ার আগেই তাদের এসব পণ্য অনেক সময় আগেভাগে মার্কেটে পাওয়া যায়। অল্প সংখ্যক হলেও এ কারণে তাদের ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ বিষয়ে বন্দর ব্যবহারকারী চট্টগ্রামের অন্যতম ওষুধ কোম্পানি অ্যালভিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান রাইসুল উদ্দিন সৈকত বলেন, বন্দরের অভ্যন্তরে প্রায় সময় চুরির ঘটনা ঘটে। একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বন্দরে রাখা কন্টেইনার থেকে পণ্য চুরি করে। তার কোম্পানির জন্য আনা কাঁচামালও অনেক সময় চুরি হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিন গ্রুপে বিভক্ত শ্রমিকরা: চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা-অক্ষমতা অনেকটা নির্ভর করে বন্দরের শ্রমিকদের ওপর। এক সময় শ্রমিক আন্দোলনের ফলে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকত। বর্তমানে এ পরিস্থিতি না থাকলেও পণ্য পরিবহনে পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে অনেক সময় জাহাজজট ও কন্টেইনার জট সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে চট্টগ্রামের সাবেক সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরী সমর্থিত একটি গ্রুপ রয়েছে। অপর গ্রুপ সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন চৌধুরী সমর্থিত। এ ছাড়াও বিএনপি সমর্থিত নিষ্ক্রিয় একটি গ্রুপ রয়েছে। এ তিন গ্রুপের টার্মিনাল প্রাধ্যনতা, বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থানে অনেক সময় বন্দরের অভ্যন্তরে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে বলে বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান।
এনসিটির সফলতায় কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে রেকর্ড: চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩০ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয় ২০১৫ সালে। এ বছর সাড়ে ২৪ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়। এটি বন্দরের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব সাফল্য। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৯টি জেটিতে জাহাজ ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে জেনারেল কার্গো বার্থে (জেসিবি) ১২, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) ৫, চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) জেটিতে দুটি জাহাজ থেকে একসঙ্গে পণ্য খালাস ও বোঝাই চলে। এর বাইরে বন্দরের অন্য ১৬টি ঘাটেও বিশেষ করে লাইটার জাহাজে পণ্য লোড-আনলোড হয়ে থাকে। এসবের মধ্যে ৫০ শতাংশ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে থাকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। এনসিটির আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষ জনশক্তির কারণে এ সফলতা এসেছে বলে দাবি করেন এনসিটির কর্ণধার ও সাইফপাওয়াটেকের এমডি তরফদার রুহুল আমিন। তিনি জানান, এনসিটির মাধ্যমে ২০১৫ সালে বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে। এটা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
কমোডর এম ইকবাল হোসেন জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরের ছোটখাটো সমস্যাগুলো অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে। এ ছাড়াও বন্দর আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালনা হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য বন্দরের চেয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অনেকটা এগিয়ে আছে। আগামীতে বিশ্বের কয়েকটি সেরা বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর একটি হবে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম জানান, জাহাজজট সৃষ্টি হয়েছে অতিরিক্ত পণ্য আমদানির কারণে। দেশের আমদানি বাড়লে তো জাহাজের সংখ্যা বাড়বেই। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুরো এলাকাজুড়ে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে। এতে মাঝে মাঝে সংঘটিত হওয়া চুরির ঘটনা কমে যাবে। এ ছাড়াও বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে এনসিটির সহযোগিতা অবশ্যই রয়েছে। আগামীতে চট্টগ্রাম বন্দরের সার্বিক চিত্র আরো আধুনিক হবে বলে তিনি জানান। এ ছাড়াও বন্দরের নিরাপত্তায় ইতিমধ্যে আরো বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি জানান।







শেষ পাতা'র আরও খবর

অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর
প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২
ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । মানবকণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র ও অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর, প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২ ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com