শিরোনাম :
দাম্পত্য কলহে দু’সন্তানকে হত্যা করে নিজের গলায় ফাঁস দিয়েছেন আনিকা
Published : Thursday, 12 January, 2017 at 12:00 AM
শফিকুল বারী
দাম্পত্য কলহে অকালেই ঝরে গেল তিনটি প্রাণ। অন্ধ অভিমানে, ক্রোধে গৃহবধূ আনিকা ফাঁস দিয়ে আত্মঘাতী হওয়ার আগে নিজের নাড়িছেঁড়া ধন দুই সন্তান শামীমা ও আবদুল্লাহকে গলা কেটে হত্যা করেন। গত মঙ্গলবার রাজধানীর দারুস সালামের ছোট দিয়াবাড়ী বড় মসজিদ গলির ২৯/১ নম্বর বাসায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্বামী শামীম হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সরেজমিন ছোট দিয়াবাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, বড় মসজিদের পাশ দিয়ে সরু একটি গলিপথ দক্ষিণ দিকে গেছে। এতই সরু যে, এ পথে কোনো যানবাহন চলতে পারে না। গলির পশ্চিম পাশে ১০ কক্ষের সায়েদ মাস্টারের বাড়ি। উপরে মরচেধরা টিনের চাল ও আস্তর ছাড়া দেয়াল। ছোট ছোট খুপড়ির মতো এক পাশে ৫টি কক্ষ, মাঝখানে চলাচলের জন্য ৪/৫ ফুট প্রশস্ত লম্বা জায়গা ও অপর পাশে ৫টি কক্ষ। এক মাথায় গণশৌচাগার। এ বাড়িতে যারা ভাড়ায় থাকছেন তারা সবাই দিনমজুর বা গার্মেন্টসকর্মী। এমনই একটি কক্ষে ফুট ফুটে চাঁদের মতো দুই সন্তান নিয়ে গত দেড় বছর ধরে ভাড়া থাকেন শামীম-আনিকা দম্পতি। বড় মেয়ে শামীমার বয়স ৫ বছর ও ছোট ছেলে আব্দুল্লাহর বয়স ৩ বছর। আশপাশে প্রতিবেশীদের কাছে এ ঘটনার কোনো সঠিক কারণ পাওয়া যায়নি। তারা অবাক ও বিস্মিত হয়েছেন এ ঘটনায়। নিহত আনিকাদের কক্ষের বিপরীতে থাকেন আঞ্জুয়ারা বেগম। তিনি বাড্ডার একটি মার্কেটে পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, আসার পর থেকেই ওদের দেখছি। সুন্দর সুন্দর দুটি ছেলে মেয়ে নিয়ে তারা ভালোই ছিলেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তেমন কোনো ঝগড়া-ঝাটি দেখিনি। ছেলে মেয়ে দুটিকেও খুব আদর-যতœ করত দুজনেই। কিন্তু হঠাৎ কী এমন হলো যে, আনিকা নিজেও মরল সঙ্গে দুই সন্তানকেও নিয়ে গেল। আমরা ভাবতেও পারছি না। ঘটনার সময় প্রতিবেশীরা প্রায় সবাই নিজ নিজ কাজে ছিলেন। তাই তারা তেমন কিছুই বলতে পারেননি। সবার এক কথা-আমরা বিস্মিত!
এদিকে গতকাল বুধবার দুপুর দেড়টায় আনিকার মা নাদিরা বেগম গ্রামের বাড়ি থেকে এসে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে একটি মামলা করেছেন। একমাত্র আসামি করা হয়েছে আনিকার স্বামী শামীম হোসেনকে।
অপর দিকে, দুপুর ২টায় দারুসসালাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফারুকুল আলম উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এ সময় দারুসসালাম ও শাহ আলী থানার দায়িত্বরত সহকারী কমিশনার (এসি) মো. মামুন মোস্তাফা উপস্থিত ছিলেন। এক প্রশ্নে পরিদর্শক ফারুক বলেন, আপাতত দাম্পত্য কলহ মনে হচ্ছে। বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদে আরো তথ্য জানা যাবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত শামীম হোসেন বলেছেন, মঙ্গলবার সকালে খেতে চাইলে আনিকা তাকে বাসি ভাত খেতে দেন। এ নিয়ে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে শামীম আনিকাকে বাপ-মা জড়িয়ে অকথ্য ভাষায় গাল দেন। পরে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের মহাসমাবেশে যোগ দেন। ওখান থেকে আসার পর রাতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। এ ছাড়া সে তেমন কিছু বলেনি। এ বিষয়ে নিহত আনিকার মা শামীমকে আসামি করে গতকাল দুপুরে একটি মামলা করেছেন। এর আগে মঙ্গলবার রাতেই শামীমকে আটক করা হয়।
বাদী হয়ে মামলা করলেও আনিকার মা নাদিরা বেগম সংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। আনিকার ভাই রাশিদুল হক বলেন, গত ৯ বছর আগে শামীমের সঙ্গে আনিকার বিয়ে হয়। কোনো দিন শামীমকে খারাপ কিছু করতে দেখিনি বা শুনিনি। আনিকাও কোনো দিন শামীমের বিষয়ে কোনো অভিযোগ করেনি। দুই সন্তান নিয়ে তারা সুখে আছে জানতাম। তবে ছোটবেলা থেকেই আনিকার জেদ একটু বেশি। রেগে গেলে ওর কোন হুঁশ থাকে না। সকালে শামীমের সঙ্গে কথা কাটাকাটির পরে অতিরিক্ত জেদের কারণে আনিকা এ নির্মম ঘটনা ঘটায় বলে আমাদের ধারণা।
এদিকে ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক প্রদীপ বিশ্বাস গণমাধ্যমকে জানান, শিশু শামীমা ও আব্দুল্লাহকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। আর মা আনিকার গলায় গভীর কালো দাগ পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের পর আনিকা ও তার মেয়েদের লাশ বুঝে নেন মামা ইসরাফিল। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে লাশ নিয়ে নওগাঁ জেলার মহাদেবপুরের বনগ্রামের নিজ বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয় স্বজনরা। আনিকার বাবার নাম মৃত আয়নুল হক গেদু।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর ২টার মধ্যে যে কোনো সময় ছোট দিয়া বাড়ি বড় মসজিদ গলির ওই ভাড়া বাসায় দুই শিশু সন্তানকে গলা কটে হত্যা করে মা আনিকা নিজে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। দুপুরে প্রতিবেশীরা ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে একটি শিশু ওই কক্ষের জানালার সানসেটে উঠে টিনের চালের ফাঁকা জায়গা দিয়ে আনিকাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। খবর দিলে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। কিন্তু মৃত্যুর আগে আনিকা একটি সুইসাইড নোট লিখে গেছেন। তাতে লেখা ‘শামীম তোমার একটা ভুলের জন্য এত বড় ঘটনা, তুমি ভেবেছ আমি শুধু শুনব। তুমি সবার কথা ভাবো আমাদের কথা ভাবো না। আমি সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছি। আমি যেখানে ওরা সেখানে। একটাই কষ্ট মা, বাবা, ভাই, বোন, নানি আরো অনেকের মুখ দেখতে পারলাম না। ছেলেমেয়েকে নিয়ে গেলাম। আমি এই দু’হাত দিয়ে ওদেরকে খাইয়েছি, তেল মেখে দিছি আর আজ আমি সেই হাত দিয়েই ওদেরকে মারলাম। আমাকে তোমরা মাফ করে দাও। আমাদের কপালে এই ছিল। ওরা দু’জন নিষ্পাপ। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।’ নোটের শেষ দিকে একটি লাভ চিহ্নের ভেতর অনিকা নিজের ও দুই সন্তান শামীমা ও আব্দুল্লাহর নাম লিখে গেছেন।





প্রথম পাতা'র আরও খবর

অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর
প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২
ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । মানবকণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র ও অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর, প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২ ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com