শিরোনাম :
স্বজনদের চোখে জঙ্গিরা
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
Published : Wednesday, 11 January, 2017 at 8:36 AM

স্বজনদের চোখে জঙ্গিরাজঙ্গিদের প্রতি তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হচ্ছে তীব্র ঘৃণা। এমনকি নিহত জঙ্গিদের লাশ নিতেও অনীহা প্রকাশ করছেন তাদের স্বজনরা। আর নারী জঙ্গিদের অধিকাংশই এই বিপথগামিতার জন্য তাদের স্বামীদের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছে।
সাম্প্রতি বিভিন্ন অভিযানে নিহত জঙ্গিদের স্বজনদের বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এসব জঙ্গিদের অনেকেরই ছিল সুন্দর সাজানো সংসার। উচ্চবিলাসী জীবন। সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু এই ভ্রান্ত পথে পা দিয়ে আজ তারা সর্বস্বান্ত। মৃত্যুর পর তাদেরকে শেষ দেখা দেখতেও পরিবারের কেউ আসছে না।
গুলশান ঘটনায় নিহত ৬ জঙ্গির লাশ দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেলের হিমাগারে পড়ে থাকলেও কেউ তাদের লাশ গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে গত বছরের ২৬ জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত ৯ জঙ্গির লাশও কেউ গ্রহণ করেনি। ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে আরেকটি অভিযানে জঙ্গিনেতা তামিম আহমেদ চৌধুরীসহ নিহত ৩ জঙ্গির লাশ নিতেও কেউ যোগাযোগ করেনি। এভাবে গুলশান হামলার পর বিভিন্ন অভিযানে নিহত ৪৫ জঙ্গির লাশ গ্রহণ করেনি তাদের স্বজনরা। শেষ পর্যন্ত সেগুলোর ঠাঁই হয়েছে আঞ্জুমানের কাছে।
জঙ্গি মারজানের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর তার মা সালমা খাতুনের বক্তব্য ছিল এ রকমÑ ‘সে তার কৃতকর্মের শাস্তি পেয়েছে। দেশের ক্ষতি করেছে আমার ছেলে। তার বিচার হইছে। আমি খুব খুশি। কিন্তু খারাপ লাগতাছে আমার ছেলে একটি নিষ্পাপ শিশু রেখে গেছে। ব্যাটার (ছেলে) বউটা জেলের ভেতর আছে। দেখার কেউ নাই।’
আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে আত্মঘাতী হয় জঙ্গি তানভির কাদেরী। ওই অভিযানে গ্রেফতার হন তার স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা। পরবর্তী সময়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বর্ণনা দেন জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট। জানান কিভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে তছনছ হয়ে পড়ে তার সংসার। খাদিজা জানান, তার স্বামী উচ্চ বেতনে চাকরি করত। তিনি নিজেও এক লাখ ৯ হাজার টাকা বেতনে সেভ দ্য চিলড্রেনে চাকরি করতেন। দুই যমজ সন্তান পড়াশোনা করত রাজধানীর ভালো একটি স্কুলে। উত্তরায় ছিল তাদের নিজেদের ফ্ল্যাট। কিন্তু স্বামী জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে বাধ্য করা হয় চাকরি ছাড়তে। একই সঙ্গে ছেলেদেরও স্কুল ছেড়ে দিতে হয়। বিক্রি করে দেন ফ্ল্যাট। সব টাকা ব্যয় করা হয় জঙ্গি কাজে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার স্বামী তাকে বাধ্য করেছে এ পথে আসতে। স্বামীর কারণেই তার সুখের সংসার তছনছ হয়ে গেছে।
উল্লেখ্য, এই দম্পতির এক সন্তান বর্তমানে আটক আছে। আরেক সন্তান আশকোনায় জঙ্গিবিরোধী অভিযানে আত্মঘাতী হয়েছে।
আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটি) ইউনিটের অভিযানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন নারী জঙ্গি সাকিরা। ওই ঘটনায় তার শিশু সন্তান সাবিনা আহত হয়। সাকিরা ছিলেন পলাতক জঙ্গি সুমনের স্ত্রী। শিশু সাবিনার নানা শাহে আলম চৌকিদার সংবাদ পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিলেন মেয়ের লাশ শনাক্ত করতে। এরপর তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাতনিকে দেখতে যান। এ সময় তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মেয়ের কৃতকর্মের জন্য তিনি নিজেই একঘরে হয়ে আছেন। সমাজে কিভাবে মুখ দেখাবেন। শিশুটি নানার কাছে গিয়ে ভালোভাবে বড় হয়ে উঠতে পারবে কিনা, তা নিয়েও শঙ্কা আছে। কি করব ভেবে পাচ্ছিন না। সাবিনার মা-ই ওরে এতিম করল। আল্লাহ ছাড়া আর কে থাকল ওর? নাতনিরে দেইখা আর মন মানাইতে পারতেছি না। সাকিরার প্রতি ঘিন্না ছাড়া আর কিচ্ছু নাই। ছোট বাচ্চারে কলঙ্ক দিয়া গেল। সাবিনা যেখানে যাবে মানুষ মনে করাইয়া দিব যে ওর মা কী ছিল। স্কুল-কলেজ-বিয়া সবখানেই এই কলঙ্ক থাকল।’  
আর উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান মেজর জাহিদের স্ত্রী শিলা এখন অনুতপ্ত। তিনি ফিরে যেতে চান তার দুই সন্তানের কাছে। শিলার মা জোহরা খাতুন ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মেয়ে খুবই বিলাসী জীবন কাটিয়েছে। আর সেই মেয়ে আজ রিমান্ডে! কোলের সন্তানটা কঙ্কালের মতো হয়ে গেছে। জাহিদই (মেয়ে জামাই) আমার মেয়ের সর্বনাশ করেছে।’
উল্লেখ্য, রাজধানীর কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নিহত হয় সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত জঙ্গি নেতা মেজর জাহিদ। আর আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের পর আত্মসমর্পণ করে জেবুন্নাহার শিলা।
স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন পলাতক জঙ্গি মুসার স্ত্রী তৃষা মনি ওরফে তৃষাও। গত বছরের ২৪ নভেম্বর রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনার জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে একপর্যায়ে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত নিহত জঙ্গি মেজর জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা ও মুসার স্ত্রী তৃষা দুই শিশু সন্তানসহ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, রিমান্ডে তৃষা জানিয়েছে স্বামীর জঙ্গি কার্যক্রমকে ঘৃণা করতেন তিনি। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের সন্তান তৃষার পক্ষে স্বামীকে ত্যাগ করাও সম্ভব ছিল না। একসময় জঙ্গি আস্তানা থেকে পালানোর সুযোগও খুঁজতে থাকে। তৃষা যে কোনো সময় পালিয়ে যেতে পারে এটা জানত মুসা। তাই স্ত্রীকে সবসময় কড়া নজরদারির মধ্যে রাখত। জঙ্গি আস্তানার বন্দি জীবন সম্পর্কে তৃষা গোয়েন্দাদের জানান, সেটা ছিল একটি জেলখানার মতো। স্বাভাবিক জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন এক জীবন!
এদিকে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে আটক করা হয় মোহাম্মদপুরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত মারজানের স্ত্রী প্রিয়তিসহ তিন জঙ্গির স্ত্রীকে। পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দাদের জিঙ্গাসাবাদে প্রিয়তি পুলিশকে জানান, মারজান ছিল খুবই স্বৈরাচারী। সে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাকে জঙ্গি কাজে সম্পৃক্ত করে। তা না হলে মারজান তাকে ত্যাগ করার হুমকি দিত। প্রিয়তি লেখাপড়া তেমন জানতেন না। বড় হয়েছেন মামার বাড়িতে। তাকে দেখভালের মতো কোনো অভিভাবকও নেই। তাই নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীর চাপে তিনি জঙ্গি কাজে জড়িয়ে পড়েন।

মানবকণ্ঠ/আরএস





অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর
প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২
ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । মানবকণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র ও অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর, প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২ ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com