শিরোনাম :
চার শতাধিক বিলাসবহুল গাড়ির খোঁজে শুল্ক গোয়েন্দারা
হরলাল রায় সাগর
Published : Wednesday, 11 January, 2017 at 8:29 AM
চার শতাধিক বিলাসবহুল গাড়ির খোঁজে শুল্ক গোয়েন্দারাকূটনীতিক সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত অত্যন্ত বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করতেন বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কৃত ঢাকায় উত্তর কোরিয়া দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি হ্যান সন ইক। ২০১৫ সালে রুপালি রঙের রোলস রয়েস গোস্ট মডেলের ৩০ কোটি টাকা দামের এই গাড়িটি বিএমডব্লিউ এক্স ৫ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ৬৬০০ সিসির এই গাড়ির শুল্ককর প্রায় ২২ কোটি টাকা। তাই  শুল্ক ফাঁকি দিতেই আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দেয়া হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সোমবার এই বিলাসবহুল গাড়িটি রাজধানীর আইসিডি কমলাপুর বন্দর থেকে জব্দ করেছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। তবে এর আগে গত বছরের ২৮ আগস্ট কূটনীতিক হ্যান সনকে সিগারেট চোরাচালানের দায়ে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
লন্ডন প্রবাসী সিলেটের রূপা মিয়া পর্যটন ভিসায় দেশে আসেন ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর। সঙ্গে তিনি কারনেট সুবিধায় আরএক্স ৩০০ মডেলের কালো রঙের একটি লেক্সাস জিপ নিয়ে আসেন। পরে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে সিলেটেই বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন করা হয় গাড়িটির। এরপর তিনি গাড়িটি বিক্রি করে দেন। কাগজপত্রে বলা হয়, গাড়িটি ২০১৪ সালের ২৯ মে জাপান থেকে আমদানি     করা হয়েছে। পরে শুল্ক গোয়েন্দারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, নিবন্ধনের জন্য জমা দেয়া কাগজপত্র একটি পোশাক রফতানিকারকের পণ্যের চালানের। ২০০৪ সালে তৈরি গাড়িটির মূল্য দুই কোটি টাকা। দুই বছর আগে সিলেটের এন কে কর্পোরেশন থেকে ৭৫ লাখ টাকায় গাড়িটি কেনেন এক ব্যবসায়ী। শুল্ক গোয়েন্দারা ২৫ জুন সুনামগঞ্জ শহরের হাজীপাড়া থেকে গাড়িটি আটক করেন।
এভাবে কূটনীতিক, প্রবাসী, পর্যটক, জনপ্রতিনিধি ও বিশেষ ব্যক্তিরা শুল্কমুক্ত (কারনেট) সুবিধা নিয়ে বিদেশ থেকে বিলাসী গাড়ি আমদানি করছেন। এ ছাড়া মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা গাড়িতে দেয়া হচ্ছে শুল্ককর ফাঁকিও। উচ্চ মূল্যের গাড়ি আমদানির সঙ্গে সংযুক্ত কাগজপত্রে কমদামি গাড়ির তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি হস্তান্তর করার সুযোগ না থাকলেও ভুয়া কাগজপত্রে নিবন্ধন করে বিক্রি করে দেয়া হয় গাড়ি। ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া নম্বর প্লেটও। এতে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। জনপ্রতিনিধি, বিত্তশালী-প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মডেলরা অবৈধ এই গাড়ির অন্যতম ক্রেতা। শুল্ক গোয়েন্দাদের হিসেবে বর্তমানে চার শতাধিক অবৈধ বিলাসবহুল গাড়ি দেশের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এসব অবৈধ গাড়ির সন্ধানে মাঠে নেমেছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। পেতেছেন ফাঁদ। ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে গত এক বছরে এ ধরনের ৩৯টি অবৈধ বিলাসী গাড়ি আটক করা হয়েছে। তবে শুল্ক গোয়েন্দারা এসব গাড়ির মালিক কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে আটক করতে পারেননি। বিভাগীয় মামলা দিয়েই খালাস তারা। এ ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান মানবকণ্ঠকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক চুক্তির কারণে কূটনীতিক ও সুবিধাভোগী ব্যক্তি বিভিন্ন শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করেন। এদের একটি অংশ শুল্ক ফাঁকিতে জড়িয়ে পড়েছেন। এমনকি তারা মানিলন্ডারিংও করছেন। এ রকম চার শতাধিক বিলাসবহুল গাড়ির অপব্যবহার হচ্ছে দেশে। এসব গাড়ির সন্ধান ও আটকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। শুল্ক আইন লঙ্ঘনের অপরাধে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সূত্র জানায়, ‘কারনেট দ্য প্যাসেজ’ আইনের আওতায় একজন পর্যটক ইচ্ছা করলে গাড়ি নিয়ে শুল্ক ছাড়াই কোনো দেশে যেতে পারেন। তবে শর্ত হলো ফিরে যাওয়ার সময় গাড়িটি সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য পর্যটকদের ‘রয়েল অটোমোবাইল ক্লাব অব ইউকে’ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। অধিকাংশ দেশেই এ ক্লাবের শাখা থাকলেও বাংলাদেশে নেই। তবে কারনেটের নামে পর্যটকবেশে শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আনা হচ্ছে দেশে। এ সুবিধায় আনা গাড়ির মেয়াদ ছয় মাস থেকে এক বছর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম না হলে যৌক্তিক আবেদনে অবস্থানকাল বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় পর্যটকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবৈধভাবে গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে যান। কারনেট সুবিধার বাইরে কয়েকটি খাতের বিশেষ ব্যক্তি বিশেষ করে কূটনীতিক, বিদেশি ও শিল্পপতিরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানি করতে পারেন। বিদেশিদের ক্ষেত্রে এসব গাড়ি নির্দিষ্ট সময় পর নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়ার কথা। কিন্তু অনেকেই গাড়ি আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্কমুক্ত ও পর্যটন সুবিধার অপব্যবহার করছেন।
শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা গাড়ির মধ্যে আছে, বিভিন্ন মডেলের মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, ল্যান্ড রোভার, রেঞ্জ রোভার, রোলস রয়েস. পোর্শে, লেক্সাস, ওডি রেসিং কার, হ্যামারসহ বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি। মডেল ভেদে এসব গাড়ির দাম এক কোটি টাকা থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত। চার হাজার সিসির ওপরে এ ধরনের গাড়ি আমদানির শুল্ক, সম্পূরক শুল্কসহ মোট শুল্ককর পরিশোধ করতে হয় ৮৪০ শতাংশ হারে। আর ১৫০০ সিসির নিচে গাড়ি আমদানিতে কর দিতে হয় ১৪০ শতাংশ। গাড়ির আমদানিতে খরচ বহুগুণ হওয়ায় কৌশলে কারনেট সুবিধার আওতায় গাড়ি আনা হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণায় কমদামি গাড়ির পরিবর্তে বেশি দামের গাড়ি আনা হয়। শুল্কমুক্ত আমদানি করা এ ধরনের গাড়ির বেশি অপব্যবহার করছেন বিদেশি ও বহুজাতিক সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক ও পর্যটন সুবিধাধারীরা।
শুল্ক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শুল্কমুক্ত সুবিধা ও শুল্ক ফাঁকি দেয়া এমন চার শতাধিক গাড়ি ছড়িয়ে আছে ঢাকার অভিজাত এলাকাসহ সারাদেশে। কৌশলে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে নিবন্ধন নিয়ে রাস্তায় চলছে এসব গাড়ি।
অভিযোগ আছে, বিআরটিএ, শুল্ক গোয়েন্দা, এনবিআর ও পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় এই অবৈধ কারবার চলছে। এসব দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন শুধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতিই নন, শিক্ষক ও শোবিজ তারকারাও। অবৈধ এই গাড়ির মালিকদের কেউ কেউ ধরা খাওয়ার ভয়ে রাস্তায় কিংবা কোনো গ্যারেজে এগুলো রেখে পালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ গাড়ি উদ্ধারও করছেন শুল্ক গোয়েন্দারা।
১ জানুয়ারি গুলশানের ৮০ নম্বর সড়কের ১ নম্বর বাড়িতে ইংলিশ ইন অ্যাকশন নামে একটি সংস্থার কার্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জুনিয়র প্রফেশনাল মিজ নিসকে জ্যানসেন এবং ২২ ডিসেম্বর আরেক কর্মকর্তা কিশোর কুমার সিংয়ের মারুতি সুজুকি ব্র্যান্ডের দেড় কোটি টাকা দামের পাজেরো জিপ গাড়ি আটক করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। গাড়ি দুটি অবৈধভাবে বিক্রি করে দেয়া হয়।
গুলশান-২ নম্বর থেকে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা বিএমডব্লিউ এক্স-ফাইভ মডেলের একটি গাড়ি জব্দ করা হয়। জাফর সাদেক চৌধুরী নামের এক ব্যবসায়ী ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে এই গাড়িটি আমদানি করেন।
২৮ নভেম্বর উত্তরা থেকে ইউএনডিপির সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর স্টিফেন প্রিসনারের ব্যবহƒত মিতসুবিশি পাজেরো ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি আটক করা হয়। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা এক কোটি টাকা দামের এ গাড়িটি সংস্থাটির কর্মচারী আশিকুল হাসিব তারিকের কাছে বিক্রি করে দেন তিনি।
গত বছরের ২৮ আগস্ট রাতে রাজধানীর কাকরাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর কার্যালয়ের সামনে রাস্তা থেকে পরিত্যক্ত মার্সিডিজ বেঞ্জ ব্র্যান্ডের একটি গাড়ি জব্দ করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। গাড়ির ভেতর পাওয়া একটি খোলা চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমার দখলে থাকা গাড়িটি শুল্ক গোয়েন্দা সদর দফতরে জমা দিলাম। আমি এ গাড়িটি জমা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। আমার মতো অন্যরাও যেন অনুরূপভাবে অবৈধ গাড়ি জমা দেন।’ লাল রঙের দুই দরজার এ গাড়িটি এসএলকে ২৩০ মডেলের। ইঞ্জিন ক্যাপাসিটি ২৩০০ সিসি। এটি ২০০২ সালে তৈরি। কারনেট সুবিধায় গাড়িটি আনা হয়েছিল, যার মূল্য তিন কোটি টাকা। ১ আগস্ট চট্টগ্রামে শুল্ক ফাঁকি দেয়া প্রায় ১১ কোটি টাকা দামের রেঞ্জ রোভার ও পোরশে মডেলের দুটি গাড়ি আটক করা হয়।
৬ এপ্রিল গুলশান-১ নম্বরে ৩৩ নম্বর সড়কের বাসা থেকে মডেল জাকিয়া মুনের ৩ কোটি টাকা দামের পোর্শে মডেলের একটি গাড়ি আটক করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। অবৈধভাবে আমদানি করা তিন কোটি টাকা দামের বিএমডব্লিউ এক্স-ফাইভ মডেলের একটি গাড়ি ৪ এপ্রিল গুলশান থেকে আটক করা হয়। গাড়িটি ব্যবহার করতেন বুয়েটের শিক্ষক কাজী ফাহরিবা মোস্তফা।
২ সেপ্টেম্বর সিলেটের লন্ডনি রোড থেকে জাগুয়ার এস, ৫ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজার থেকে নিশান ৩০০-জেড এক্স ও ২২ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল রোডের একটি ওয়ার্কশপ থেকে মিতসুবিশি গাড়ি জব্দ করা হয়।
মংলা বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আনা ভক্সওয়াগন গল্ফ এস মডেলের একটি গাড়ি রাজধানীর কাকরাইল থেকে ২৬ জুলাই আটক করা হয়। মিরপুরের দারুস সালামের আনন্দনগরে শহীদুল্লাহর বাসা থেকে ১৯ জুলাই বিএমডব্লিউ মডেলের একটি গাড়ি আটক করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া নম্বর-প্লেট ব্যবহার করা তিন কোটি টাকা দামের এই গাড়ির মালিক রোপেন নামের গুলশানের এক ব্যবসায়ী। কারনেট সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকি দেয়ায় ২৫ জুন সুনামগঞ্জ সদরের হাজীপাড়ার একটি বাসা থেকে চার কোটি টাকা দামের লেক্সাস জিপ (আরএক্স৩০০) আটক করেন শুল্ক গোয়েন্দারা।
গত বছরের ১০ মার্চ ৩৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চারটি গাড়ি অবৈধভাবে আমদানি করায় দুবাই এভিয়েশন কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা করেছেন শুল্ক গোয়েন্দা।


মানবকণ্ঠ/আরএস





অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর
প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২
ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । মানবকণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র ও অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর, প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২ ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com