শিরোনাম :
দেশ-বিদেশের জঙ্গিদের ঈগল দৃষ্টি
কামাল লোহানী
Published : Monday, 9 January, 2017 at 9:18 AM
দেশ-বিদেশের জঙ্গিদের ঈগল দৃষ্টি৮ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে মানবকণ্ঠসহ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় জঙ্গি সংক্রান্ত নতুন তথ্য-উপাত্ত মিলেছে। উঠে এসেছে উদ্বেগজনক আরো কিছু নতুন তথ্য। দেশ-বিদেশের জঙ্গি-উগ্রবাদীরা বাংলাদেশের ওপর ঈগল দৃষ্টি ফেলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সদস্যদের অভিযান ও সতর্ক নজরদারির পরও থেমে নেই তাদের অপক্রিয়া। এরা নতুন নতুন কৌশলে এগোচ্ছে এবং এখন তারা শিশুদের স্কুলে পর্যন্ত দৃষ্টি ফেলেছে এমন খবরও পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। নব্য জেএমবির সদস্যরা গোপনে সংঘবদ্ধ হচ্ছে। পলাতক আরো কিছু উগ্রবাদী-জঙ্গি বড় হুমকির কারণ হয়ে আছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এরা এদের ভ্রান্ত ধারণাকে পুঁজি করে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিষ ছড়ানোর অপক্রিয়া চালিয়েই যাচ্ছে।
নিকট অতীতে রাজধানী ঢাকার আশকোনা এলাকায় একটি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সদস্যরা দীর্ঘক্ষণ সেখানে অভিযান চালান। ওই অভিযানের সময় আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটে এবং নানা কারণে এই ঘটনাটি আমাদের বিশেষভাবে মনোযোগ দাবি করেছে। প্রথমত, আশকোনার ঘটনাটি প্রায় এক বছরের ব্যবধানে আরেকটি আত্মঘাতী হামলার ঘটনা এবং দ্বিতীয়ত, আবারো কোনো নারীর প্রত্যক্ষ জঙ্গি হামলার সঙ্গে জড়িত হওয়ার ঘটনা। এসব ঘটনা আমাদের দেশে জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদের প্রকৃতি ও এর প্রভাব অনুধাবন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিছুদিন আগে গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় জঙ্গিদের বর্বরোচিত তাণ্ডবের পর ধারণা করা হয়েছিল প্রশাসনের যে কঠোর নজরদারি ও তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে জঙ্গি-উগ্রবাদীরা তাদের কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে। কিন্তু না এরপরও ঘটনা ঘটেছে এবং সর্বশেষ ঘটনা ঘটল আশকোনায়।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বড়দিনে বনানীর গির্জায় হামলা চালানো ছিল জঙ্গিদের টার্গেট। ইংরেজি নববর্ষের অনুষ্ঠানও তাদের টার্গেটে ছিল বলে পত্রিকা মারফতই জানা গেছে। তবে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রত্যেকটি সংস্থার দায়িত্বশীল সদস্যদের অবশ্যই ধন্যবাদ জানাতে হবে যে, তাদের সতর্ক ও সজাগ দৃষ্টির কারণেই দেশবাসী আরো একটি মর্মন্তুদ ঘটনা প্রত্যক্ষ করা থেকে রক্ষা পেয়েছে। এত সতর্ক-সজাগ দৃষ্টি, লাগাতার অভিযান, সামাজিক সচেতনা ক্রমবৃদ্ধি ইত্যাদি কোনো কিছুই বিভ্রান্ত, হটকারী ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির কীটদের নিবৃত্ত করতে পারছে না। তারা ধর্মের নামে ধর্মবিরুদ্ধ কাজে ব্যাপকভাবে এখনো তৎপর এবং তাদের শাখা-প্রশাখা যে এখনো অনেক ছড়ানো-ছিটানো বিদ্যমান বাস্তবতা এরও সাক্ষ্যবহ। নানা নামে, ব্যানারে ওরা সদা গজাচ্ছে এবং অপতৎপরতার ছক কষে চলেছে। ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে অন্য একটি দৈনিকে প্রকাশ, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে শক্তি সঞ্চয় করেছে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল ইয়াকিন। অনেকটা আইএস স্টাইলেই চলছে তাদের কার্যক্রম। তাদের নাকি প্রধান লক্ষ্য (ওই প্রতিবেদনে প্রকাশ) বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের একটি অংশ নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন। জঙ্গি গবেষকদের ধারণা, অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের মতো এই সংগঠনটিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠতে পারে। আমরা মনে করি পত্রিকায় প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনের মর্মার্থ দায়িত্বশীলদের আমলে নেয়া উচিত এবং দ্রুত এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
এ দেশে উগ্রবাদী-জঙ্গিরা প্রাকৃতিকভাবে গজায়নি কিংবা বেড়ে ওঠেনি। বিশ্বের আরো যেসব দেশে জঙ্গিদের চরম বর্বরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে সেসব ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই। এসবই রাজনৈতিক কারণে এবং মদতে সৃষ্ট এবং এর প্রেক্ষাপটও স্পষ্ট। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে আমাদের দেশে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের বিষবৃক্ষ ডালপালা ছড়াতে থাকে এবং জামায়াত-বিএনপির কোনো কোনো ব্যক্তি তখন বলেছেন জঙ্গি বলে কিছু নেই সবই মিডিয়ার সৃষ্টি। তাদের এসব বক্তব্য অনেক কিছু স্পষ্ট করে দিয়েছিল। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের সহযোগিতায় এ ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থান নেয় এবং এক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতাও অর্জন করে। কিন্তু সম্প্রতি হঠাৎ করে আবার চক্রান্তের জাল বিস্তার করতে শুরু করেছে। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশেও এর ঢেউ এসে লেগেছে বেশ আগেই এবং এক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক মদত অতীতে যেমন পেয়েছে এখনো পাচ্ছে নানাভাবে। এমন অভিযোগ যথেষ্ট পুষ্ট। এদের শিকড়ও অনেক গভীরে প্রোথিত। যদি তাই না হতো তাহলে এত অভিযান ও সতর্ক অবস্থানের পরও থেমে থেমে এরা এভাবে গজিয়ে উঠত না। কাজেই এই অন্ধকার দূর করতে সরকার জনগণকে আরো সম্পৃক্ত করে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক গণজাগরণ ঘটিয়ে এদের বিরুদ্ধে আরো দৃঢ় অবস্থান নিক এটাই হলো বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মূল কথা।
এ দেশের সিংহভাগ মানুষ ধার্মিক কিন্তু ধর্মান্ধ নন। তারা ধর্মের নামে খুনোখুনি, রক্তারক্তি কখনো মেনে নেননি, ভবিষ্যতেও নেবেন না। এর প্রমাণ যেমন আমরা একাত্তরে পেয়েছি তেমনি পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশেও বহুবার। মানুষ পরিচয়ধারী কীটসমদের মূলোৎপাটনে আমাদের শক্তিটা এখানেই। কাজেই এক্ষেত্রে কোনো রকম দোদুল্যমানতা কাম্য নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে সাফল্য ও অর্জন কম নয়। দুুর্মুখেরা যে যাই বলুক, ইতিহাসের এসব অধ্যায় কোনোভাবেই কেউ মুছে ফেলতে পারবে না শত অপচেষ্টা চালিয়েও। আমরা খুব সঙ্গতই বিশ্বাস করি, ধর্মান্ধরা উগ্রবাদের যে পথ বেছে নিয়েছে ধর্মের নামে তা সাধারণ মানুষ অত্যন্ত দৃঢ়ভাবেই অতীতের মতো প্রত্যাখ্যান করবে এবং রুখে দাঁড়াবে।
আবারো বলি, রাজধানীর দক্ষিণখানের পূর্ব আশকোনায় কাউন্টার টেররিজম ইউনিয়নের নেতৃত্বে সোয়াট টিমের জঙ্গিবিরোধী অভিযানটি নানা কারণে ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ওই অভিযানে আত্মঘাতী গ্রেনেড বিস্ফোরণে নারীসহ নিহত হয় দুই জঙ্গি আর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে দুই শিশুসহ দুই নারী। উদ্ধার হয়েছে প্রাণঘাতী অনেক কিছু। দেশে এই যে প্রথম আত্মঘাতী নারী ও কিশোর জঙ্গির সন্ধান পাওয়া গেল তা এ ব্যাপারে আমাদের উদ্বেগজনক ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। জঙ্গিরা প্রযুক্তির আনুকূল্যে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত ও সহজসাধ্য এবং কম ব্যয় সাপেক্ষ করে তুলেছে। ইংরেজি বছরের শেষ ও নতুন বছরের আগমনের প্রাক্কালে তারা আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছিল নাশকতা চালানোর উদ্দেশ্যে। নারী-শিশু-কিশোরদের যারা জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত করেছে তাদের নিশ্চয় একটা ভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। তারা কোন অপ-নকশার ভিত্তিতে এগোচ্ছিল তা হয়তো তদন্তে বের হয়ে আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরা কতটা বর্বর এবং অন্ধ যে নিজের শিশু-কিশোর সন্তানদের পর্যন্ত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে! এর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কী হতে পারে তা বলতে পারবেন মনোবিজ্ঞানীরা। যদি সরকার ও আমরা যূথবদ্ধভাবে এদের মূলোৎপাটনে দৃঢ় থাকি এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক গণজাগরণের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে এর ঢেউ ছড়িয়ে দিতে পারে তাহলে এ পথও নিশ্চয় রুদ্ধ হয়ে পড়বে।
বৈশ্বিকভাবে আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটলেও একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী অন্ধকারের শক্তির ভাটাও লক্ষণীয়। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এর প্রমাণ মিলছে। তবে এখনো আমাদের এখানেও দেশি-বিদেশি উগ্রবাদী-জঙ্গিরা নানা নামে, নানা ব্যানারে সংঘবদ্ধ হয়ে হুমকির কারণ হচ্ছে। জঙ্গি-উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের অভিযানের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। এরা ধর্মের শত্রু। মানবতার শত্রু। সভ্যতার শত্রু। দেশ-জাতির শত্রু। সামগ্রিকভাবে সাধারণ মানুষের মনে জঙ্গিবাদ প্রত্যাখ্যান করার এবং তা মোকাবিলা করার ব্যাপারে কোনো ভিন্নমত নেই। এটাই আমাদের মূল শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগাতে  হবে। এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। আমাদের গোয়েন্দাদের এ ব্যাপারে সাম্প্রতিক তৎপরতা সন্তোষজনক। কিন্তু অভিযানের ব্যাপারে আরো পরিকল্পিত ও দূরদর্শী উদ্যোগ নেয়ার তবে এখনো ছক কষা প্রয়োজন বলে মনে করি। এরা তথ্য প্রযুক্তিসহ সব ক্ষেত্রেই এখন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক পারঙ্গম এবং কৌশলী। তাই এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেই পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। তাদের পেছনে অর্থের জোগানের বিষয়টিও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই সব কিছু মিলিয়ে হাত দিতে হবে উৎসে।

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক।

মানবকণ্ঠ/এসএস





অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর
প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২
ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । মানবকণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র ও অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর, প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২ ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com