শিরোনাম :
রোহিঙ্গা ইস্যু: দায় মিয়ানমারের
মীর আফরোজ জামান
Published : Sunday, 8 January, 2017 at 11:52 AM
রোহিঙ্গা ইস্যু: দায় মিয়ানমারেরগত অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেখানকার সরকারি বাহিনীর হামলায় শতাধিক রোহিঙ্গা নিহত এবং ৩০ হাজারের বেশি গৃহহারা হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাব মতে, নতুন করে ৩৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছে। গত ৯ অক্টোবরের পর থেকে রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধন শুরু হয়। প্রথম সাত দিনের মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গুলিতে শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সে দেশে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রবেশে সরকারের বাধা-নিষেধের কারণে অদ্যাবধি নিহতের সংখ্যা কত শত বা হাজারে গিয়ে পৌঁছেছে, তা নির্ণয় করার কোনো সুযোগ নেই। এদিকে ৯ অক্টোবরের পর থেকে সেনা অভিযানের কারণে নিরাপত্তার সন্ধানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী সারি সারি লাশ পানিতে ভাসছিল এবং গুলিবিদ্ধ অনেককে সেনাবাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশ সরকার নির্যাতিত রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর প্রতি মানবিক আচরণ প্রদর্শন করে আসছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে ২৫ বছর ধরে। ১৯৭৮ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রথমবারের মতো প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার পর ১৯৮০ সালে তাদের মিয়ানমার ফেরত নিলেও ১৯৯১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো মিয়ানমার থেকে আরো দুই লাখ ৫৬ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৯৯৭ সাল নাগাদ বাংলাদেশ সরকার, মিয়ানমার ও ইউএনএইচসিআরের তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে তাদের ফেরত পাঠানো হলেও সেই থেকে আজ অবধি প্রায় ৩২ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের দুটি শরণার্থী শিবিরে রয়ে গেছে; যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এর আগে ফেরত যাওয়াদের একটি অংশসহ আরো প্রায় পাঁচ লাখ নতুন করে ফিরে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, যারা আইনের দৃষ্টিতে অবৈধভাবে কক্সবাজার, টেকনাফসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করছে এবং কথিত রয়েছে যে তারা মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অস্ত্র পরিবহনসহ নানা ধরনের নাশকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যের দায়ভার আমরা নিতে পারি না। প্রায় অর্ধশতাব্দীর সামরিক শাসনের পর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সু চির দল সরকার গঠনের মাত্র আট মাসের মাথায় ফের সামরিক শাসনের কায়দায় বেসামরিক সরকারের নির্দেশে যেভাবে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে তা কোনোভাবেই মানবাধিকারকে সংরক্ষণ করে না। সামরিক নির্যাতনে দেশটির শুধু রোহিঙ্গা মুসলমানরাই নয়, উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সে দেশের রাখাইন জনগোষ্ঠীও। যার পুরো দায়ভার মিয়ানমার সরকারের। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের রক্ষার ব্যাপারে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন তাদের মানবিক আশ্রয় প্রদানের জন্য অনুরোধ জানালেও অদ্যাবধি মিয়ানমার সরকার কর্তৃক ক্রমাগত চলতে থাকা রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে জাতিসংঘ কর্তৃক কোনো নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ কিংবা কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত। রোহিঙ্গা মুসলিমদের কাছে জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি সম্প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ৭০ জন পার্লামেন্ট সদস্য। বিবৃতিতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর সাম্প্রতিক নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ‘আমরা মিয়ানমার সীমান্তে সাম্প্রতিক সহিংসতার নিন্দা জানাই এবং অবিলম্বে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনকে লক্ষ্য করে সহিংসতার অবসান চাই।’ রোহিঙ্গাদের কাছে পূর্ণাঙ্গ মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর অনুমোদন দিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারেরও অবশ্যই যোগ দেয়া দরকার বলে উল্লেখ করেন তারা। সহিংস পরিস্থিতি থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের যথাসম্ভব সহায়তার জন্যও আহ্বান জানানো হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে শুধু ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যরাই সোচ্চার হননি, একইভাবে এবারে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো আসিয়ানের প্রভাবশালী দুই সদস্য রাষ্ট্রও সক্রিয় হয়েছে। যদিও ১৯৯৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার সমর্থনে আসিয়ানের সদস্য হয় মিয়ানমার। তবে রোহিঙ্গা ইস্যু ইন্দোনেশিয়ার তৎপরতা বিষয়টিকে এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এমনকি ঢাকা সফরে এসে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুডি টেকনাফের উখিয়ায় কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করে মন্তব্য করেছিলেন, ‘শরণার্থীদের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ এবং শরণার্থীদের সহায়তা দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো বেশি কিছু করা উচিত।’ একইসঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া এক বিবৃতিতেও বলা হয়েছিল রোহিঙ্গা সমস্যার উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধান সেখানেই হতে হবে বলে। আসিয়ানের দুই প্রভাবশালী সদস্য ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে সক্রিয়। তাদের এই তৎপরতা অব্যাহত থাকলে মিয়ানমারকে সমস্যা সমাধানে আগ্রহী করা যাবে। আর আমাদের এই সুযোগকেই কাজে লাগাতে হবে। মানবাধিকার কিংবা মানবতাবিরোধী কোনো অপরাধ আমরা সমর্থন করতে পারি না। মিয়ানমার সরকার কর্তৃক পরিচালিত অভিযানে যদি মানবাধিকারের ব্যত্যয় ঘটে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাদের এ ব্যাপারে চাপ প্রয়োগ করে এ অবস্থার অবসানে ভূমিকা পালন করা। বাংলাদেশ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতি অনেক মানবিক। কিন্তু এই দায় বাংলাদেশের একার নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেভাবে মিয়ানমার ইস্যুতে সক্রিয় হয়ে উঠছে, তাকে কাজে লাগিয়েই এ সমস্যা সমাধানে আমাদের কাজ করতে হবে। যাতে করে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকে এবং সমস্যাটির সমাধান বেরিয়ে আসে।

লেখক: ভারতের দৈনিক কালান্তর, পত্রিকার বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিবেদক

মানবকণ্ঠ/আরএস





অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর
প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২
ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । মানবকণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র ও অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আনিস আলমগীর, প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২ ফোনঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৩-৫, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৫৫০৪৪৯৪৮
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com