শিরোনাম :
বৃত্তি দিয়ে প্রযুক্তি কর্মী তৈরির নীরব বিপ্লব
Published : Friday, 24 April, 2015 at 9:26 PM
তামজিদুল আমিন। স্নাতক করার সময় বাবাকে হারান। দুই বোন আর মায়ের সংসারের সব দায়িত্ব আসে তার কাঁধেই। চাকরি খুঁজতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারেন চাকরির বাজারে কেবল স্নাতক থাকলেই হয় না। অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো দাম নেই! তার পরও ঘুম ঘুম চোখে পত্রিকার পাতায় চাকরির বিজ্ঞাপন কেটে আবেদন করতে গিয়ে একদিন চোখে পড়ে একটি প্রশিক্ষণের বিজ্ঞপ্তি। টাকা লাগবে না দেখে ঝটপট আবেদন করে ফেলেন। আর সেই প্রশিক্ষণের কল্যাণেই দুঃেেখর দিনের অবসান ঘটে। তামজিদ এখন দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংকের বিজনেস ইন্টেলিজেন্স প্রকৌশলী। ছাত্রাবস্থা থেকেই একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন শাহজাহান আলী। স্বপ্নর নাগাল পেতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকত্তোরও শেষ করেন। কিন্তু বিসিএস পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষায় স্বপ্ন ভঙ্গ। আশা ভঙ্গের যাতনায় ঢাকায় আসেন একটি কোনো রকম চাকরির সন্ধানে। কিন্তু মানবিক শিক্ষার্থীদের জন্য চাকরি যেন সোনার হরিণ! অতঃপর আশ্রয়দাতা বন্ধুর পরামর্শে পরীক্ষা দিয়ে পেয়ে যান আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ স্কলারশিপ। বিনা পয়সায় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাসিক ভাতা পাওয়া তখন তার কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতোই। আর অধ্যবসায় আর কঠোর অনুশীলনের ফলে আজ তিনি একজন ওরাকল সার্টিফায়েড প্রফেশনাল হিসেবে চাকরি করছেন স্কয়ার ইনফরমেটিকসে। তামজিদ আর শাহজাহানের চেয়ে নাজুক অবস্থায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ছিটকে পড়া মু. কার্জন রেজা চৌধুরী। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করে নামের পাশে ‘ভ্যাগাবন্ড’ ভর্ৎসনা ঘুচিয়ে একই স্কলারশিপের কল্যাণে আজ তিনি মালয়েশিয়ার শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডোমেইন টেকনোলজিসে কাজ করছেন গ্লোবাল সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে।  
এভাবেই এক যুগ ধরে প্রযুক্তি কর্মী তৈরিতে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ ইসলামিক সলিডোরি অ্যাডুকেশন ওয়াক্ফ প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণদের স্থানীয় ট্রেনিং সার্ভিস প্রোভাইডারদের (টিএসপি) মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সমন্বিত আইটি প্রফেশনাল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আর বিনা খরচার কম্পিউটার প্রযুক্তির এই পেশাদারী প্রশিক্ষণ নিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছেন স্বপ্ন ভঙ্গ হাজার হাজার তরুণ। কেননা কেবল হাতে কলমে প্রশিক্ষণ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাবঞ্চিত মেধাবীদের যোগ্যতা অনুযায়ী দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাইয়ে দিতেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। একেক জন কর্মীর পেছনে প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয় করছে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ ছাড়াও ভেন্ডর সার্টিফিকেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ২৫ হাজার এবং প্রতিমাসে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করছে ২ হাজার টাকা। এরপর আবার প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে মাসে দুই হাজার টাকা করে হাত খরচ বাবদ দেয়া হয়।
অভিযাত্রার এক যুগে : মেধাবী যুব সমাজের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ২০০৩ সাল থেকে পেশাদারী ডিপ্লোমা কোর্স দিয়ে যাত্রা শুরু। অল্প দিনের মধ্যেই কোর্স মডিউলে যুক্ত হয় মাইক্রোসফট ও ওরাকলের মোট ছয়টি পেশাদারী আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্তির প্রকল্প। ইতোমধ্যে ২৮তম রাউন্ড শেষে প্রায় ১০ হাজার প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ। এদের মধ্যে ৫ হাজারেরও বেশি প্রশিক্ষণার্থী দেশ-বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় কাজ করছেন। অনেকেই দেশে বসেই মুক্ত পেশাজীবনে নাম লিখিয়ে বিশ্বকর্মীরা স্বীকৃতি পেয়েছেন। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ শেষ করে বেসিস সেরা পদক জয় করে মু. এনামুল হকের মতো অনেকেই দেশের ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটি গড়ে তুলতে কাজ করছেন।   
বৃত্তি পদ্ধতি : একেবারেই নির্মোহভাবে প্রকল্পের অধীনে আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। পিছিয়ে পড়াদের এগিয়ে নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কমপক্ষে দ্বিতীয় বিভাগ বা ২.২৫ জিপিএপ্রাপ্তরা স্কলারশিপ পেলেও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকদের এই কোর্সে নেয় হয় না। তবে আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ পরিচালিত ফাস্ট ট্র্যাক আইটি কোর্সে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকরা আবেদন করতে পারেন। প্রতি ধাপে ৩০০ জন করে বছরে এক হাজার দু’শ’ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানো হয়। আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। এমসিকিউ পদ্ধতিতে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নেয়া হয় মৌখিক পরীক্ষা। মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। এই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা ও চট্টগ্রামে। প্রশিক্ষণ শুরু হয় জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। সপ্তাহে ছয় দিন চার ঘণ্টা করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মনোনীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ক্লাস নেন দেশের প্রথিতযশা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। কোর্সের প্রায় সব কার্যক্রমই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ক্লাসের কী পড়ানো হচ্ছে, কারা উপস্থিত বা অনুপস্থিত থাকছে এর সব তথ্যই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিদর্শন করা হয়। মোট  ২৬টি ট্রেনিং সার্ভিস প্রোভাইডারদের মাধ্যমে নিবিড় পরিচর্যা আর প্রশিক্ষণের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা হয়। এ বিষয়ে ট্রেনিং সার্ভিস প্রোভাইডার ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটির নির্বাহী পরিচালক মোহাম¥দ নূরুজ্জামান জানালেন, আইডিবির এই বৃত্তিমূলক পেশাদার প্রশিক্ষণ কোর্সটি গতানুগতিক প্রশিক্ষণ থেকে আলাদা। এখানে শিক্ষার্থী এবং প্রশিক্ষণার্থী উভয়কেই কঠোর অনুশীলন আর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে কোর্স শেষ করতে হয়। থাম্ব স্ক্যানিংয়ের মাধমে যেমন শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করতে হয়। একই সঙ্গে পর পর তিন দিন অনুপস্থিত থাকলে কিংবা পর পর দু’বার মাসিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে স্কলারশিপও বাতিল হয়ে যায়। তিনি বললেন, এখানে সি শার্প, জাভা, অটোক্যাড, সিএএ ইত্যাদি বিষয়ে প্রতি ব্যাচে ১৫ জনকে পেশাদার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ফলে প্রশিক্ষণ শেষে শতভাগই চাকরি পেয়ে থাকেন।
প্রযুক্তির ৮ কোর্স : কর্মক্ষেত্রের চাহিদার ভিত্তিতে প্রযুক্তিতে নবিস তরুণদের আইসিটি কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে বিশেষ মডিউলে সাজানো হয়েছে আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউর কোর্সগুলো। আবার প্রান্তিক অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত তরুণরা যেন সহজেই এই কোর্সের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন সে জন্য রয়েছে নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থাও। কম্পিউটার প্রযুক্তির বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের পাশপাশি মোট ৮টি ক্যাটাগরিতে সিলেবাসভিত্তিক ল্যাব প্রশিক্ষণ দেয়া হয় আইডিবির এই দক্ষ আইটি কর্মী তৈরির মিশনে। কোর্সগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ কম্পিউটার ফান্ডামেন্টাল, আর্কিটেকচারাল অ্যান্ড সিভিল ক্যাড, কম্পিউটার অ্যাসিসটেড এনিমেশন, ডেটাবেজ ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, এন্টারপ্রাইজ সিস্টেম এনালাইসিস অ্যান্ড ডিজাইন, নেটওয়ার্কিং এবং ওয়েব প্রেজেন্স সল্যুশন অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন। এসব প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে শতকরা ৭৫ জনই রয়েছেন মফস্বল শহরের সন্তান।  
আন্তর্জাতিক সনদ : মাত্র এক বছরের প্রশিক্ষণ শেষে এখানকার আন্তর্জাতিক মানের সুপরিসর ল্যাবে বসেই আন্তর্জাতিক সনদ লাভ করছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। অথচ এক বছর আগেও স্থানীয় পর্যায়ের চাকরি  পাওয়া ছিল সোনার হরিণ হাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার। প্রযুক্তিতে কোনো রকম প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান বা পড়াশোনা না থাকলেও এই অদক্ষ তরুণদেরই বিশ্ব কর্মীর স্বীকৃতি দিতে উদ্যোগ নিয়েছে আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ। বিনামূল্যেই মাইক্রোসফট ও ওরাকালের মতো আইটি ভেন্ডর সার্টিফিকেশন যেমনÑ আরএইচসিই, এমসিএসই, ওসিপি প্রভৃতি পরীক্ষা দিতে পারেন স্কলারশিপপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা। শতকরা ৯৫ ভাগ প্রশিক্ষণার্থীই এখন প্রাইভেট এবং পাবলিক সেক্টরের বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা, বায়িং হাউস, আইটি ফার্ম, এনজিও প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত রয়েছেন। এমনকি বুয়েটের স্নাতকদের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে মালয়েশিয়া, আবুধাবি, কানাডা, আমেরিকা ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের সফটওয়্যার ফার্মগুলোতেও শীর্ষ পদে কাজ করছেন অনেকেই।  প্রশিক্ষণ শেষে ৫০ হাজার টাকার মতো গড় বেতনে চাকরি করছেন। আবার কেউ কেউ নিজেরাই গড়ে তুলছেন নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র।  প্রযুক্তি-দক্ষ কর্মীর সংখ্যাকে জ্যামিতিক হারে বাড়াতে আইডিবি-বিআইএসইডব্লিউ প্রকল্পে রয়েছে অনলাইন ক্যারিয়ার হাব। এর মাধ্যমে নিয়োগ দাতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের ইপ্সিত কর্মস্থল খুঁজে নিতে পারেন প্রশিক্ষণার্থীরা। একই সঙ্গে চলে দ্বৈত কাউন্সেলিং। ডিজিটাল বৈষম্য ঘুচতে প্রযুক্তি নিরপেক্ষ কর্মসংস্থানে নিভৃতে যে বিপ্লব ঘটে চলছে এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ অচিরেই আইটি সেবাদাতা দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়াজ খান। বললেন, ‘কেবল প্রশিক্ষণের মধ্যেই আমরা আমাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখিনি। তাই কোথাও চাকরির বিজ্ঞপ্তি হলে সেখানে আমাদের প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়ে আবেদন করাই। সাক্ষাৎকার দিলে আমরা আবার তাকে যাচাই-বাছাই করি। আমরা বোঝার চেষ্টা করি সে কোনো ভুল করেছে কি না। তার ভুল থাকলে সেগুলো শুধরে দেয়ার চেষ্টা করে থাকি। আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।’     




তাপমাত্রা
ঢাকা : ২৯°সে
অ্যাপস ও ফিড
সামাজিক নেটওয়ার্ক
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আবু বকর চৌধুরী
প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২
ফোনঃ +৮৮-০২-৯৮৯২৮৩২, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৯৮৯৩৮০৯
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । মানবকণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র ও অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আবু বকর চৌধুরী, প্রকাশক : জাকারিয়া চৌধুরী
রোড -১৩৮, প্লট - ১/এ, গুলশান-১, ঢাকা-১২১২ ফোনঃ +৮৮-০২-৯৮৯২৮৩২, ফ্যাক্সঃ +৮৮-০২-৯৮৯৩৮০৯
ই-মেইল : info@manobkantha.com, mkonlinedesk@gmail.com