সিরিয়া সংকট: নতুন জাতিসংঘ প্রধানের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাবেক পর্তুগিজ প্রধানমন্ত্রী এন্টেনিও গুতেরেসকে বিশ্ব সংস্থাটির মহাসচিবের পদে মনোনয়ন দিয়েছে। অনেকের মধ্যে প্রশ্ন, এতে করে তার হাতে কি একটি বিষাক্তপত্র তুলে দেয়া হলো না? জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব ট্রাইগভেলি এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে দুঃসাধ্য আখ্যায়িত করেছিলেন এবং আসলেই গুতেরেসকে এই কণ্টক মুকুট পরিয়ে দেয়া হলো এ জন্য যে ইতোমধ্যেই গুতেরেসের উদ্বাস্তুবিষয়ক জাতিসংঘেই এগারো বছর হাইকমিশনার পদে থাকার অভিজ্ঞতা তার নব লব্ধ পদটির অনুকূলে এসে থাকবে।
বলা বাহুল্য, গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত ভূমধ্যসাগর উপকূলবর্তী প্রাচীন এই আরব দেশটির ধ্বংসযজ্ঞ প্রাথমিক পর্যায়েই গুতেরেস প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং সে সময়ে সমঝোতা ও দেশটি পুনর্গঠনের যে ক্ষীণ শিখাটি নিবু নিবু জ্বলছিল সে সবই আজ হিংস্রতায় অপচয়িত অতীতের ব্যাপার। সিরিয়ার সংকট ইতোমধ্যে একটি পয়েন্ট অব নো রিটার্নে পৌঁছেছে। অবশ্য তার কারণও আছে। ইতোমধ্যে শুধু বিশ্ব পরিস্থিতিই বদলায়নি। সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে সংকটের দৃশ্যপট, সংঘাতের চালিকাশক্তি এবং সংশ্লিষ্টদের কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন। তাছাড়া ইতিহাসও তো বলে যে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলরা সংকটে-বিপর্যয়ে বড় জোর সেক্রেটারিই থেকেছেন। জেনারেলদের মতো সেগুলোর চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারেননি। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক বা নিয়ামক হওয়া অতীতে তাদের জন্য দিবাস্বপ্নই ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট জাতিসংঘ প্রধানের এমনই মূল্যায়ন করেছিলেন। শান্তি স্থাপন তো আরো অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘ আমলারা তা কখনোই পারেন না। তাদের কাজ বড় জোর সেই লক্ষ্যে একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। শান্তি, সন্ধি, চুক্তি এসবই রাজনীতিকদের পরিসর।
জাতিসংঘের সপ্তম মহাসচিব কফি আনান যিনি সংস্থার করিডরে ঘুরে ঘুরে জাতিসংঘ কূটনীতির সবক নিয়েছিলেন তার একটি বিখ্যাত উক্তি অনুযায়ী কোনো কিছু করার ম্যান্ডেট পাওয়া এক কথা এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সঠিক পরিমাণ জনবল অর্থ বা তথ্য ইত্যাদি পাওয়া অন্য কথা এবং তা পাওয়া যায় না বলেই প্রদত্ত কাজে মহাসচিবদের ব্যর্থতা অবধারিত ব্যর্থতার সব দায়ও বর্তায় ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে ব্যর্থ মহাসচিবের ওপরই। এই পদে পূর্বসূরিদের কেউ একজন যথার্থই বলেছিলেন, এসজি- সংক্ষিপ্ত রূপটি সেক্রেটারি জেনারেলের জন্য না হয়ে স্কেপগোটের জন্য হওয়া উচিত। বাস্তবেও কিছু কিছু জাতিসংঘ সেক্রেটারি জেনারেল ব্যর্থতার দায় ঘাড়ে নিয়ে স্কেপগোট রূপেই বিশ্ব সংস্থা ছেড়েছেন।
অথচ যে কোনো সংকটে হা বলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ বৃহৎ শক্তিরা যারা নিরাপত্তা পরিষদে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শুরু থেকেই বহাল রেখেছে। যে কারণেই বিশ্ব সংস্থা ভুল করুক বা ব্যর্থ হোক আসল দোষীদের না পাকড়িয়ে মহাসচিবকেই দোষ না করেও দোষের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করতে হয়। ‘সেক্রেটারি জেনারেল’ শিরোনামের গ্রন্থটির গ্রন্থকার সিমন চেস্টারম্যান এবং টমাস ফ্রাঙ্ক বলেছেন যে, পদটিকে কখনো কখনো ভারার্পিত কার্য নির্বাহকে বা বক্সিং অনুশীলনের জন্য মুষ্টাঘাতের বস্তা হিসেবে দেখা হয়। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেজ নামের ওয়েব সাইটে ব্যক্ত পছন্দ অনুযায়ী সেক্রেটারি জেনারেল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা অথবা স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হলে ভালো হতো। কোনো কোনো মহাসচিব স্বাধীনচেতা ছিলেন। তারা তাদের নিয়োগকর্তা নিরাপত্তা পরিষদকে থোরাই কেয়ার করেছেন। তারা তাদের বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে দাগ্ হ্যামার শোল্ডের কথা অনেকের স্মরণ থাকতে পারে যিনি এক রহস্যাবৃত বিমান দুর্ঘটনায় সদ্য স্বাধীন কঙ্গো যাওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। জানা যায় যে, হ্যামার শোল্ড যিনি কঙ্গোর গৃহযুদ্ধ নিরসনে নিরাপত্তা পরিষদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কঙ্গো যাচ্ছিলেন। নিরাপত্তা পরিষদের কোনো এক সদস্য শক্তির খনিজ সমৃদ্ধ কঙ্গোর কাতাঙ্গা প্রদেশে লোলুপ দৃষ্টি ছিল এবং প্রদেশটি প্যাটিস লুবাম্বা শাসিত বাম সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাইছিল।
নিরাপত্তা পরিষদের কোনো এক শক্তিধর দেশের সঙ্গে সংঘাতের ফলশ্রুতিতে মিসরের কপটিক খ্রিস্টান বংশোদ্ভূত বুট্টস ঘালি তার দ্বিতীয় মেয়াদ থেকে বঞ্চিত হন। ঘালিই একমাত্র মহাসচিব যাকে এক মেয়াদের অধিক ওই পদে থাকতে দেয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় ঘালিকে এককভাবে রুয়ান্ডায় গণহত্যার জন্য দোষারোপ করেছিল যদিও রুয়ান্ডার ঘাতকদের স্পর্শকাতর তথ্যটি ঘালির অজানা ছিল না। কিন্তু তার পদের মর্যাদা রক্ষার্থে তিনি এ নিয়ে কোনো বচসায় লিপ্ত হতে চাননি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে নতুন মহাসচিব গুতেরেস কি করবেন? কে হবে তার চালিকাশক্তি? নিরাপত্তা পরিষদ অথবা তার বিবেক গুতেরেস পতুর্গালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পূর্বে বাম রাজনীতি করেছেন। স্বৈরশাসক সালজারের বিরুদ্ধে লড়েছেন। বোঝাই যায় যে তার বিবেকের শক্ত কোষ তাকে সেক্রেটারি জেনারেলের আমলাতান্ত্রিক কুসুমাস্তীর্ণ পথ মাড়াতে দেবে না। এক কথা গুতেরেসেরও অজানা নয়। তিনি ইতোমধ্যেই বলেছেন যে, তার ওপর একটি অসম্ভব কাজ ন্যস্ত হয়েছে। তবে তার কথায় তিনি তো এই কাজ থেকে পিছু হটতে পারবেন না।
পূর্বেও নিরাপত্তা পরিষদ বিভক্ত থাকলেও তার একটি প্যাটার্ন ছিল। নিরাপত্তা পরিষদের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ছিল। কিন্তু আমেরিকার ট্রাম্প প্রেসিডেন্সিতে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া একটি গুরুত্ব ফ্যাক্টর হবে। তাছাড়াও ইইউ ভেঙে গেলে ইউরোপে ক্ষমতার ভারসাম্য ও সমীকরণ দুই-ই বদলে যাবে। নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্বকারী
সদস্য অবশ্য বলেছেন যে, তার দেশ নতুন
সেক্রেটারি জেনারেলকে তার নৈতিক কর্তৃত্ব প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যা জাতিসংঘ প্রধানকে ঘিরে উত্থিত হয়েছে, তাহলো- নিরাপত্তা পরিষদ না ব্যক্তি সেক্রেটারি জেনারেল-কে থাকবেন বিশ্ব সংস্থার চালকের আসনে। দীর্ঘদিন পরে হলেও প্রশ্নটির একটি আশু মীমাংসা দরকার।
লেখক: সাবেক মহাপরিচালক
বিআইআইএসএস ও কলামিস্ট। সাবেক সেনা
কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

মানবকণ্ঠ/এসএস