রোহিঙ্গা: আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর সেনাবাহিনীর নিপীড়ন, ধর্ষণ, গণহত্যা ও বিতাড়নের কারণে দেশটিতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে, সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার প্রতিবেদন উত্থাপনের পর এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আরো সোচ্চার হচ্ছে। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চার সদস্যের একটি তদন্ত দল গতকাল শনিবার ঢাকায় এসেছে। দলটি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলবে এবং নির্যাতনের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে।
মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসছেন এশিয়া বিষয়ক চীনের বিশেষ দূত সান গোসিয়াং। আগামী ২০ মার্চ তিন দিনের সফরে তার ঢাকায় আসার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে তার এই সফরটি স্থগিত করা হয়েছে। তবে শিগগিরই সফরের নতুন দিনক্ষণ জানানো হবে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক চাপ থেকে মিয়ানমারকে রক্ষা করতেই চীন এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে চায়। যদিও রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনকে একাধিকবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে চীন রাজি হয়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মিয়ানমারে জরুরি ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক সত্যানুসন্ধান মিশন পাঠিয়ে দেশটির সেনারা রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা-ধর্ষণসহ যে অত্যাচার চালিয়েছে তা তদন্ত করার জন্য বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের কাছে আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়নের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের দেয়া একটি বিবৃতি আটকে দিয়েছে চীন ও রাশিয়া। শুক্রবার নিরাপত্তা কাউন্সিলের ১৫ সদস্য দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে। এরপর বিবৃতিটি দেয়ার কথা থাকলেও রাশিয়ার সমর্থন নিয়ে চীন এতে বাদ সাধে। এতে বিবৃতিটি আটকে যায়।
এ ছাড়া রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কফি আনান কমিশন। কমিশন রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। রাখাইন রাজ্যের সংকট দূর করতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পরামর্শও দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, অবাধ চলাচল এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব থাকা দরকার। এ ছাড়া আন্তঃদেশীয় সন্ত্রাস প্রতিরোধে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা থাকা প্রয়োজন।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চীনের বিশেষ দূত সান গোসিয়াং শিগগিরই ঢাকা সফরে আসবেন এবং পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এ সময় রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করবেন। মূলত রেহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর লক্ষ্যেই তিনি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবেন। সূত্র জানায়, মিয়ানমার আমাদের নিকট প্রতিবেশী। সেখানকার অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা মিয়ানমারে স্থিতিশীল অবস্থা দেখতে চাই এবং সে কারণে চীনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করব। আমরা মিয়ানমার পরিস্থিতি সম্পর্কে চীনের অবস্থান জানতে চেয়েছি। তারা আমাদের বলেছে, এটি মিয়ানমারের সমস্যা এবং এর সমাধান তাদেরই করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিয়াংকেও কক্সবাজারে গিয়ে রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিন দেখার জন্য একাধিকবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু তিনি যাননি। এবার চীন সরকারের বিশেষ এজেন্ডা নিয়ে ঢাকায় আসতে চান সান গোসিয়াং।
এর আগেও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বাংলাদেশে প্রবেশ করা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়ে কথা বলতে ঢাকায় আসেন দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির বিশেষ দূত ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিয়াও থিন। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে বিশেষ দূত শুধু বাংলাদেশের কথা শুনেছেন, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ফেরত ব্যাপারে কোনো প্রতিশ্রুতি বা দায় নেয়ার কথা বলেননি।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে সোমবার রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বিতাড়ন কৌশল নেয়ার অভিযোগ তুলেছে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটির মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি রাখাইন রাজ্য ও বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকা পরিদর্শন করে যে প্রতিবেদন মানবাধিকার কাউন্সিলে পেশ করেছেন, তাতে উল্লেখ করা হয় দেশটির আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ করে চলেছে সামরিক বাহিনী ও পুলিশ। দেশটি রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত করতে চায়। মানবাধিকার কাউন্সিলে প্রতিবেদন উত্থাপন অনুষ্ঠানে দেশটির ক্ষমতাসীন দলের প্রধান ও স্টেট কাউন্সিলর নোবেলজয়ী অং স?ান সুচিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি যাননি। এর আগে জাতিসংঘ দূত ইয়াংহি লিকে আরাকানের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ঢুকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেয়নি দেশটির সরকার। তবে সেখানে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারে লি জানান, পরিস্থিতি এতটাই খারাপ, যা তার ধারণারও বাইরে। জাতিসংঘের এ দূত বলেন, মিয়ানমারে মানবতাবিরোধী অপরাধ চলছে। মানবতার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হচ্ছে- মিয়ানমারের লোকজন, দেশটির সামরিক বাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ বা অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী এই অপরাধ করছে। তিনি দাবি করেন, কৌশলগতভাবে এই নিপীড়ন চালিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। কিন্তু অং সান সুচির সরকারকে অবশ্যই এই অপরাধের কিছু না কিছু দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। লি মনে করেন, দিন শেষে সেখানে বেসামরিক সরকার রাষ্ট্র চালাচ্ছে। ওই সরকারকেই এসবের উত্তর দিতে হবে। তাদেরই ভয়ানক নির্যাতনের গণঅভিযোগের জবাব দিতে হবে। তারা নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে যে অমানবিক অপরাধ করছে তারও জবাব দিতে হবে।
গত অক্টোবর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর জীবন বাঁচাতে দেশ ছাড়েন লাখো মানুষ। নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন অন্তত ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা। এই রোহিঙ্গাদের একটা বড় অংশই দেশে ফিরতে ইচ্ছুক। কিন্তু তাদের আশঙ্কা, মিয়ানমার সরকার তাদের আর দেশে ফেরার সুযোগ দিচ্ছে না।

মানবকণ্ঠ/আরএস