যবদুল ভায়ের অন্তর্ধান : জিয়াউল সরকার

যবদুল ভাই, জোনাক জ্বলা অন্ধকারে। রেল লাইনের স্লিপার দিয়ে হাঁটে। বিড়ি টানে আর একা হাঁটে। ঘন অন্ধকারে বিড়ির আগুনের বিন্দু ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। হঠাৎ সে নিজেকে রেল ইঞ্জিন ভাবে আর দোর্দণ্ড প্রতাপে স্লিপারে কদম ফেলে। তার ফিলিংস আরো জোরালো হয়। নিজেকে রেল ইঞ্জিন আর বগিগুলো তার হতাশা ব্যর্থতা, পাপ- গ্লানি, যা সে আজন্ম বয়ে বেড়াচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সংসার নামের ডাব্বা। সে উদ্ভ্রাতরে মতো টেনেই চলে।

আসলেই যবদুল ভাই একটা মানুষ। ভাবুক মানুষ। সে বিড়ি টানতে টানতে রেল গাড়ির মতোই ফুলবাড়ির ভাঙ্গা ব্রিজে এসে স্লো হয়। নিকষ অন্ধকারে জোনাকিরা মিট মিট করে। যবদুল ভাই পুলের উপর লুঙ্গি তুলে হাগতে বসে। ঝির ঝির বাতাসে বসে প্রাকৃতিক কার্য সাধন করে।

সাধনে সে খুবই তৃপ্তি বোধ করে। ভারমুক্ত হয়। তার পর পুলের ঢাল বেয়ে ধর ধর করে একদৌড়ে খালে নেমে পড়ে। ত্রস্ত ব্যাঙগুলো পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাকি ব্যাঙগুলো উদ্যত হয়ে গতিবিধি লক্ষ্য করে। যবদুল ভাই কচুরি পানা সরিয়ে পানির নাগাল পায়।

যবদুল ভাই বিশাল এক ক্যানভাসে কিছু একটা করতে চায়। গণিত শাস্ত্র তার আর ভালো লাগে না। হাত কাঁপে, অতৃপ্তিতে, ভোগে। যত বিদ্রোহ তার বুকের ভিতরে। প্রকাশ করতে গ্যালেই সমস্ত শরীর পক্ষাঘাত গ্রস্তের মতো থর থর কাঁপে। তবু সে হাল ছাড়ে না। সে কিছু একটা করবেই।

কিন্তু যে জনগোষ্ঠীর সিংহ ভাগ বাঁশঝাড়ে পাথারে-পাটক্ষেতে শঠিবনে হাগে এবং ঘাসের উপর গোয়া মোছে তাদের জন্য যবদুল ভায়ের টেনশন হয়। ঘাড় ব্যথা করে। স্যালাইন খায়।

স্যানিটারি জাতীয় চিন্তাটা মহা বোকামি। এ ব্যাপারে মিনিমাম শ’ খানেক এনজিও মালকোচা মেরে নেমে পড়েছে। প্রাইমারি স্কুলের ফার্স্ট বয়েরাই গড়ে ৪০ নম্বরের বেশি পায় না। যবদুল ভাই কী করবে ভেবে ভেবে উদাস হয়ে যায়।
ছোট নদী, হাঁটুজল, গোরু-মহিষ, কাশবন শেয়াল ইত্যাদি এঁকে দেয়ালে টাঙাতে ইচ্ছা করে।
যবদুল ভাই এখন কোথায়?- খাগড়াছড়ি তিন বছর কাটালাম রাঙ্গামাটি বান্দরবানেও ওরকম থাকার চিন্তা আছে। এভাবে আর কত দিন যবদুল ভাই?- দ্যাখো খালিদ আমি কিন্তু আপাদমস্তক মৃত্যুকে ঘৃণা করি। জীবন ভালোবাসি, অস্তিত্বেই আমার সকল বিশ্বাস। মনে রাখবে হতাশাবাদীরাই মৃত্যু নিয়ে চিন্তা করে। আমি আশাবাদী।

আপনি রেভ্যুলুশনারিতে বলেছিলেন, এখন মাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে কেমিক্যালের ভ্রুণ, বাতাসে কার্বন…… ক্রমশঃ জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে….. তো আপনি কি আপনার আইডিঅলজি থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছেন?
দ্যাখো চিন্তাগুলোকে পজেটিভলি নেয়ার চেষ্টা করো। আমি দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তির জন্য বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে বলিনি নিশ্চয়। প্রতিরোধের কথা বলেছি। সতত সুন্দর জীবনের জন্য বিপ্লবের কথা বলেছি। বলতে চেয়েছি একটা কিছু করুন। আসলে তোমরা ক্রমশঃ দ্বিধা আর সংশয় গ্রস্ত হয়ে পড়তেছ। মনে রাখবে পালিয়ে বেড়ানোর নামও জীবন। মানে হাইড এন্ড সিক। পাহাড় জঙ্গলে ম্যালেরিয়ায় ভোগার নামও জীবন। মানে শুধু সুখ নয়, কষ্টটাও জীবনের জন্য অনিবার্য। আত্মহত্যা কখনোই জীবন হতে পারে না। ওটাই মানুষের চরম পরাজয়। ‘জিন্দেগি কাভি’ না মেলেগি দোবারা। যে ভাবেই হোক বাঁচতে শেখো।

যবদুল ভাই আমরা কি ক্রমশঃ মৃত্যু চিন্তায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছি না? মৃত্যুকে ভুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টাই তার প্রমাণ। যবদুল ভাই মৃত্যু কিন্তু অমোঘ-অবধারিত। একে ভুলে থাকা অসম্ভব। মৃত্যুর একটা নান্দনিক দিকও আছে। যে সব হালুয়া, জালুয়া জীবনে তেল-সাবান মাখে নাই তাদেরকেও ধুয়ে মুছে আতর, গোলাপজল ঢেলে শুভ্র কাপড়ে মোড়ানো হবে। অন্তিম সৌভাগ্য, সৌন্দর্য।

জনবহুল রাষ্ট্রে দারিদ্র্য একটা অবধারিত ব্যাপার। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ অশিক্ষা-দুর্নীতি-শ্রেণী বৈষম্য ইত্যাদি ব্যাধি অনিবার্য। আর এসব থেকে মুক্তির চাটু নিয়ে গড়ে উঠবে একশ্রেণীর ধূর্ত প্রতিনিধি চক্র।
তার মানে শেষ অবলম্বনও আশঙ্কার খাদে!

খালিদ, আমি অনুমান করেছিলাম তুমি এমন বিস্ময়ই ব্যক্ত করবে। ভুলে যেও না, আমরা স্ট্রাগল করছি। স্ট্রাগল মানে স্ট্রাগল! স্ট্রাগল মানে সফলতা কিংবা ব্যর্থতা নয়। স্ট্রাগল মানে একলা চলোরে…
যবদুল ভায়ের ভীষণ অন্তদর্হন। সে কী করবে ভেবে পায় না। যবদুল ভাই একটা পাগল মানুষ। সে কাৎলামারির বিলে একটা বিশাল বট গাছ হয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকতে চায়। বুনোহাঁস, বকপক্ষীদের সাথে সখ্যতা করতে চায়। বাক্ স্বাধীনতাহীন মনুষ্য জীবন আর ভালো লাগে না। এবার সাপ-ব্যাঙ-কাঁকড়াদের সময় দেয়া দরকার।
যবদুল ভাই আমি আপনার সোনালি অতীতকে স্মরণ করতে চাচ্ছি। যখন মস্তিষ্কে আইডিওলজির বীজ বপন করা হতো। অর্থাৎ সেই জীবন-আদর্শ উš§াদনার কথা বলছি।

দেখ খালিদ, একটা শিশু যখন বেড়ে ওঠে তখন সবার চোখেই লাগে।-ছেলেটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। এক -সময় মানুষের দৈহিক-শারীরিক বৃদ্ধি চোখে ধরা পড়ে না। মানে দৈহিক বৃদ্ধি থেমে গ্যাছে। তাই বলে তার অন্যান্য বৃদ্ধি থেমে নেই কিন্তু।

আশা করি বুঝতে পেরেছ, আমি থেমে নেই। আমরা পৃথিবীতে কবে এসেছিলাম জানি না, কিন্তু ধারা বয়েই চলেছে। তদ্রুপ আমাদের আদর্শের উত্থান-পতন আছে মৃত্যু নাই। এর ধারাও অনন্ত, আমরা বয়েই যাব। আমি খুবই আশাহত, তোমরা স্পিরিট ধরে রাখার চেষ্টায় ঢিলেমি করছ।

যবদুল ভায়ের বাপ মাঝে মধ্যেই হাঁকডাক করে। এমন বেটাক জন্ম দিয়া পাপ করছি! রাত নাই দিন নাই পুলিশ আসিয়া খানাতল্লাশি করে। বাপ নিজেও জানে না বেটার কী দোষ। সে চোরও না ডাকাতও না। পুলিশ কেন খুঁজবে, এ জন্যই বেটার প্রতি তার এত রাগ। এই বেটা হামার বংশের মান-ইজ্জত সব ডুবালো। যবদুল ভায়ের মা বুক শেল্ফ, শোকেসের ভর্তি বইগুলো প্রতিদিন মোছে, ধুলা ঝাড়ে। তালা লাগিয়ে চাবি আঁচলে বেঁধে রাখে। বনসাইগুলোতে পানি দেয়। কেউ বই চাইলে যবদুল ভায়ের মা তেজের সাথে বলে, না কোনো বই দেয়া যাবা নয়, যবদুল আসলে রাগ হোবে। বাবা যকন আসপে তকন যত খুশি তার কাছে বই চায়া নেন। এক বছর হয়া গেলো বাদশা একটা বই নিছলো, আজো দেয় নাই। বাবা আসলে সেই বইয়ের হিসাব কেমন করি দেব হামি!

ফুলবাড়ির ভাঙ্গা পুলে কোনো এক রাতে কী ঘটেছিল কেউ ঠিকমতো বলতে পারে না। কেউ অনুমানও করতে পারে না। দেড় বছর হলো যবদুল ভাই অন্তর্ধান হয়েছে! কারণ শৈশব থেকেই আত্মগোপনের সাথে যবদুল ভাইয়ের বিশেষ সখ্যতা। তখন মানুষ বলত জিনে নিয়ে গ্যাছে। দেখা গেলো একমাস পর বোনের বাড়ি থেকে ফিরে এলো। তখন চিঠিপত্র যাইতেও ১৫ দিন এক মাস লাগতো। তখনকার মানুষ অনুমান করেই বলতে পারত, কোথায় আছে? কয়দিন থাকবে? কবে ফিরবে?
যবদুল ভায়ের মা প্রতিদিন তাকভর্তি বইয়ের ধুলো ঝাড়ে। তারপর রেললাইনের ধারে স্টেশনের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার দু’একজন সহচরের সাথে দেখা হলে যবদুল ভায়ের মা জিজ্ঞেস করে-ক্যা বাবা মানিক হামার যবদুল কখন আসবে? বিয়ান কাভাত রান্দি থুচি ভাতগুলো কড়কড়া হয়া গেল। মানিক কী উত্তর দিবে ভাবে, সময় নেয়। তার পর বলে চাচিআম্মা এখন বাড়িত যান। যবদুলভাই বোধায় পদ্মরাগে আসপে।

হাতির ঝিলে-করতোয়ায়-শীতলক্ষায়-খবরের কাগজে কত মানুষই তো ভেসে ওঠে। যবদুল ভাই কি গভীর জলের মাছ হয়ে গেল নাকি, ভাসার কোনো নাম গন্ধ নাই! যবদুল ভাইতো ফেরাউন না! যদিও ফতোয়াবাজরা তাই বলে।
যবদুল ভায়ের মা এখন রেলের ধারে উৎকর্ণ হয়ে বসে থাকে। কারো পদধ্বনি পেলেই বলে- ক্যা বাবা যবদুল আসলু নাকি? না চাচি, মুই না মিজু। -ক্যা মিজু এটা কোন গাড়ি গেল? -করতোয়া গেল, তারপর সেভেন আপ। যবদুল ভায়ের মা চোখে কিছু দেখে না। ছানি পড়ে দু’চোখই বন্ধ হয়ে গ্যাছে। যবদুলও আসে না, চোখের অপারেশনও হয় না। মিজু বলে, এখন বাড়িত যান চাচি। যবদুল ভায়ের মা উঠে দাঁড়ায়, তৎপর হয়ে আঁচলে বাঁধা চাবির থোকা হাতে নেয়। একা একাই বলে- যবদুল বাবা হামার এই রেললাইন দিয়া হাঁটি গেচে, ফির এই ঘাটা দিয়াই বাড়িত আসছে। কারো সাতে কোন দিন দাঙ্গাহাঙ্গামা করে নাই। আর খালি শুতি শুতি দিন রাত দুনিয়ার বই পড়বে। টবের মদ্দে বটের গাছ তেঁতুলের গাছ লাগে থুইছে। ঘরের মদ্দে দুনিয়ার মানুষের ফটো টাঙ্গে থুইচে, নিজের কোন ফটো নাই! কওতো বাবা এগলা পাগলামি নোয়ায়। যবদুল হামার একটা পাগলা বেটা! আচ্ছা মিজু, দুপুরকার নোকাল গাড়িটা কখন আর্সপে বাবা?

চাচিআম্মা, বাড়িত যান, যবদুলভাই আসলে দুয়ারোত খটখটাবে। রোদত্ থাকেন না, রোদত্ দেখলে, যবদুল ভাই রাগ হোবে।
অনুসারীরা ভেবে পায় না, যবদুল ভায়েরা কি এভাবেই বিলুপ্ত হতে থাকবে! তারা হতাশ নয়, তবে আশাবাদীও হতে পারে না।

মানবকণ্ঠ/মামুন রশীদ/স্বরলিপি