বুদ্ধদেব বসু-র ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’ আধুনিকতার প্রথম বীজ

প্রচণ্ড ‘খট’ শব্দে কেঁপে উঠেছিল মধ্যরাতের ইংল্যান্ড। ‘ডল হাউস’-এর নোরা ব্যভিচারী স্বামীর মুখের ওপর দরজা খুলে বেরিয়ে পড়েছিল অন্ধকারে। সমস্ত ইউরোপ কেঁপে উঠেছিল সেই শব্দে। নোরার সংগে একাত্ম হয়েছিল ইংল্যান্ড-ইউরোপের নারী। বলা হয়, ইবসেনের হাত ধরেই আধুনিক নারীর মুক্তির পথ তৈরি হয়েছিল সেদিন। নোরার মধ্যরাতের দরজা খোলার শব্দ বহুদিন শুনেছিলেন ইউরোপের মানুষ। সাহিত্যের গোত্রান্তর হয়েছিল ইবসেনের হাতেই। মনে হয়, ষড়ঋতুর বঙ্গদেশেও এমন অবিনাশী বৃষ্টির রাত বুঝি আর আসেনি। বিশ শতকের ষাটের দশকে কলকাতায় বৃষ্টির রাত এসেছিল। কি সাংঘাতিক সেই বৃষ্টি! ধ্বংস ও সৃষ্টিমুখর প্রবল বৃষ্টিপতন। বঙ্গসংস্কৃতি ও বঙ্গনারীর বক্ষভূমি কাঁপানো-সেই রাতের বৃষ্টি! এমন বৃষ্টি তো আগে আসেনি বাংলা উপন্যাসের নন্দনকাননে! যার প্রবল বেগে ভেঙে পড়ল সংস্কার ও নীতিধর্মের অচলায়তন। নীতিও শ্রেয়োর প্রশ্ন উঠল। ঔপন্যাসিক ও উপন্যাসকে যেতে হলো কলকাতার আদালতপাড়ায়। ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হলো উপন্যাস ও ঔপন্যাসিক। কেন?

তাহলে একটু ঘুরে আসি উপন্যাসের উৎসমুখে। শুনুন এই প্রথম বাংলা উপন্যাসে একজন বঙ্গনারীর ভাষ্য: ‘হয়ে গেছে-ওটা হ’য়ে গেছে-এখন আর কিছু বলার নেই। আমি, মালতী মুখোপাধ্যায় একজনের স্ত্রী আর একজনের মা, আমি ওটা করেছি। করেছি জয়ন্তর সঙ্গে, জয়ন্ত চেয়েছে, আমিও তাকে। নয়নাংশু হয়তো ভাবছে আগেই করেছিলুম, কিন্তু না-আজই প্রথম। আজ রাত্রে-চারঘণ্টা আগে। এই বিছানায়। কেমন করে হলো? খুব সহজ। সত্যি বলতে আগে কেন হয়নি জানি না-আমার সংযমে জয়ন্তর ধৈর্যে, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। রাত্তির ন’টা নাগাদ জয়ন্ত এলো, আর তক্ষুনি এমন বৃষ্টি নামল যে আধঘণ্টার মধ্যে জল দাঁড়িয়ে গেল আমাদের গলিতে। দশটা; সাড়ে দশটা-বৃষ্টি আর থামে না। অংশু গেছে তার মুমূর্ষু পিসিমাকে দেখতে বেলেঘাটায়, বুন্নি আমার মা-র কাছে থাকছে আজ, দুর্গামণি ভাঁড়ার ঘরে মাদুর বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি ফ্ল্যাটের দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে শোবার ঘরে এলুম- বৃষ্টির ছাঁটে কিছু ভিজে-টিজে যাচ্ছে কিনা দেখার জন্য। ‘আমার সিগারেট ফুরিয়ে গেল, নয়নাংশুর দেরাজে আছে নাকি দু-এক প্যাকেট? বলতে বলতে জয়ন্তও এলো শোবার ঘরে। আমি নিচু হয়ে যখন দেরাজ ঘাঁটছি তখন জয়ন্ত পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরল, আমি মুখ তুলে তাকিয়ে বললুম, তাহলে সিগারেট চাও না? সে আমার কানের ওপর ঠোঁট চেপে ডাকল, লোটন! আমি তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দিলুম। এমনি করে হয়ে গেল ব্যাপারটা। ভালো লাগছে আমার, আমার ভালো লাগছে। বুঝতে পারছি এতদিন এটা ঠেকিয়ে রেখে ভালো করিনি।’

নয়নাংশু ও মালতি দম্পতির অন্দর ও বাহিরের অসংলগ্নতা, শারীরিক সম্পর্কের শৈথিল্য, রুচি, সৌন্দর্যবোধের বৈপরীত্য, ব্যক্তিপৌরুষের প্রাবাল্যের অভাব-ইত্যাদি ভঙ্গুর করে ফেলে দাম্পত্য কাঠামো। প্রত্যেকটি চরিত্র অর্থাৎ জয়ন্ত, নয়নাংশু ও মালতীর মনোজাগতিক সঙ্গোপন মনোকথনই এই উপন্যাসের অন্তর্বয়ন করে। প্রত্যেকের মানসবিহার চলে পাঠকের সঙ্গে। প্রেমহীন দাম্পত্যজীবনের নোরা ও মালতী তো একই রক্তমাংসের নারী। নোরার অন্ধকার অন্তর্ধানের দৃশ্য আমাদের কাছে অদৃশ্য হলেও মালতীর সব কিছুই দৃশ্যমান। অকপট স্বীকারোক্তি। ‘আমি ওটা করেছি’। এই বৃষ্টিপাতের দেবতা বুদ্ধদেব বসু। উপন্যাসের নাম রাত ভ’রে বৃষ্টি। প্রকাশিত হলো ১৯৬৭-তে। জয়ন্ত নামক প্লেবয় টাইপ পুরুষটি এক আকাশ বৃষ্টি হয়ে ভাসিয়ে নিয়ে চলল এক সনাতন নারীকেই নয় শুধু-এক প্রচণ্ড প্লাবন বইয়ে দিল বঙ্গসংস্কৃতির নিস্তরঙ্গ নদীর বুকেও।
যদিও রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে এর বিমলা-নিখিলেশ ও সন্দীপ এবং শরৎচন্দ্রের গৃহদাহের অচলা সুরেশ ও মাহিমের নরনারী সম্পর্ক জটিলতার মাত্রা দেহগত সুস্পষ্টতার পুরোটাই অবগুণ্ঠিত। অর্থাৎ নারীর মুক্তি তখনও সুদূর পরাহত; কারণ পুরুষের হাতেই ছিল সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল। বন্দী পুরুষ, নারীকে মুক্তি দিতে অপারগ। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র নরনারীর নীতিগত সংস্কারের ফ্রেম ভাঙেননি। বুদ্ধদেব বসু ভেঙ্গেছেন। নানা কারণেই ভেঙ্গেছেন। ভাঙতে পেরেছেন। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর সকল প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে আঘাত লেগেছিল। আঘাত লেগেছিল শিল্পে, সাহিত্যে, ধর্ম, অর্থনীতি, জীবন ও সমাজ নীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধেও। ঐ সময় প্রবল হয়ে উঠল সেকেন্ড সেক্স বা দ্বিতীয় লিঙ্গের ধারণা।

সার্ত্রে, ফ্রয়েড, মার্কসীয় দর্শন প্রায় ট্রাডিশনাল থিওরির স্থান দখল করে শিল্পসাহিত্যের শরীরে ও ভিন্ন ভিন্ন ফ্রেম তৈরি করেছিল। তৈরি করেছিল আধুনিকতার নানা তত্ত্ব ও মতবাদ। সাম্রাজ্যবাদ ও বুর্জোয়া বাদের সঙ্গে ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে এসব থিওরি সংস্কারের বিরুদ্ধে যেন আর একটি সংস্কারের জন্ম দিয়েছিল। ফলে, ডিএইচ লরেন্স, আলবার্তো মোরাভিয়ার মতো ফ্রয়েডীয় লেখকদের পঠন-পাঠন করা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও ফরাসি এবং সংস্কৃতি সাহিত্যের অনুরাগী বুদ্ধদেব বসুর মতো এক সব্যসাচী লেখকের চিন্তাজগতে তরঙ্গাভিঘাত পড়ারই কথা। তবুও বুদ্ধদেব বসুকে আমরা কি ফ্রয়েডীয় কিংবা সার্ত্রীয় ঘরানার লেখক বলতে পারি? নিশ্চয় নয়। বিষয়টি ভেবে দেখা প্রাসঙ্গিক। কেউ কেউ তাঁকে নৈঃসঙ্গচেতনার দেহবাদী লেখক বলে শনাক্ত করতেও চান। তবে বিষয়টি ততটা সরলীকৃত নয়। বরং এই উপন্যাসটি যখন বুদ্ধদেব বসু লিখছেন অর্থাৎ বিশ শতকের ষাটের দশকে ইংল্যান্ডে তখন তৃণমূল হৈ চৈ চলছে নারীবাদী বা ফেমিনিস্ট আন্দোলনের। ফেমিনিজমের প্রতিপাদ্য বিষয়ের মধ্যে ছিল অবদমিত যৌন অতৃপ্তির বিরুদ্ধে নীতি শাসনের শৃঙ্খল ভঙ্গের প্রতিবাদ, নারীর জরায়ুর স্বাধীনতা, দাম্পত্যজীবন মানেই দেহগত দাসত্ব নয় অর্থাৎ যৌন স্বাধীনতা নারীও চায়। তাই বুদ্ধদেব বসুর এই উপন্যাস কোনো স্বপ্ন কল্পনা নেই, নেই যৌন অবদমনের জটিলতা। বরং জটিলতার গ্রন্থি উন্মোচনই এই উপন্যাসের বক্তব্য। যার ভাষ্যকার মালতী মুখোপাধ্যায়।

মালতীর ভালো লাগে না নয়নাংশুর গ্রন্থপাঠের গাম্ভীর্য, গম্ভীর স্বভাব, নির্লিপ্ত দেহবাসনা, যৌন অতৃপ্তি, মালতীর আরো ভালো লাগে না তার শরীরের গন্ধ, হাতের মোটা আঙ্গুলের স্পর্শ। যা দিয়ে মালতীর শরীরে কোন সুখের সুর সৃষ্টি করার কৌশলেও অমনোযোগী নয়নাংশু-। কেবলই সন্দেহকাতর হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত। নয়নাংশুর হীনচিত্তের কোন অনুভূতিই মালতীর স্বাতন্ত্র্যাভিলাষী মনকে আবিষ্কার করতে পারেনি-দেহকেও জাগাতেও পারেনি। অথচ একান্নবর্তী পরিবার থেকে বের করে এনে মালতীকে বন্ধুদের সামনে প্রদর্শনের একটি প্রাণহীন উপকরণের মতো উপস্থাপনেই যেন তার যত সুখ। একান্ত নিজের করে কাছে পাবার আকাক্সক্ষার সময়টিতেও নয়নাংশু ব্যস্ত থাকে বন্ধুদের নিয়ে। সেই বন্ধুদেরই একজন জয়ন্ত। জয়ন্ত জানে কী করে নারীদেহ দখল করতে হয়, মনের ওপর প্রভাব সঞ্চার করতে হয়, নারীত্বকে জাগাতে হয়, সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোর মূল্যায়ন করতে হয়, দেহ ও মনে সুর সৃষ্টি করতে হয় সব মিলিয়ে নারীত্বকে জাগিয়ে তুলে তাকে জয় করতে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে মালতী নিজেকে আবিষ্কার করে তার নারীত্ব ও তার অধিকারকেও। একই সঙ্গে-একজন নারীর শৈশব-কৈশোরের সমগ্রতা বোঝার অনুভূতিসম্পন্ন জয়ন্ত কেবল দেহ দিয়ে নয়, মন দিয়েও জয় করে নেয় মালতীকে। মালতী গোপন গর্ব অনুভব করে জয়ন্তকে নিয়ে। মালতী সুখ অনুভব করে জয়ন্তকে নিয়ে। সে বুঝতে পারে-প্রতিটি বিবাহিতা নারীই চায় স্বামীর পাশাপাশি একজন অত্যন্ত কেয়ারিং বন্ধু থাকাটা জরুরি। কারণ, স্বামীর সঙ্গে নারী যে বিষয়গুলোতে পূর্ণরূপে পায় না তা যদি বন্ধুর কাছে মেলে সেটাও নারীকে সুখী করে, পূর্ণতা দেয়। তাই মালতীর কাছে মনে হয়-‘আমিও তো রক্তমাংসের মানুষ, কেমন করে আমি ফেরাবো তাকে; আর কেনই বা ফেরাবো যে চায় আমাকে, তার মনগড়া বা হাতে গড়া পুতুলকে নয়-আমাকে আমাকে আমাকেই? যেন জয়ন্ত চিরকাল ধরে ছিল এ বাড়িতে চিরকাল ধরে থাকবে। কত অসংখ্য উপায়ে সে জানিয়েছে যে আমি তার জীবনের কেন্দ্র, তার সর্বস্ব-কোন মূল্য আমি দেবো না-আমি কি হৃদয়হীন?’ মালতী প্রচলিত ভালোমন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের মূল্যবোধ ভাঙতে চায়। তাই যে স্বামীকে সে ভালোবাসে না তাকে কেবলমাত্র শরীর দিয়ে ভুলিয়ে রাখার কদর্য আচরণ তার পক্ষে অন্যায় বরং নয়নাংশুর-‘শরীরটাকে আমি সুনজরে দেখি না, ও কখনো খালি গায়ে বাথরুম থেকে বেরুলে আমি চোখ ফিরিয়ে নিই, ওর সঙ্গে এখনও আমাকে এক ঘরে ঘুমাতে হচ্ছে তাই আমার দম আটকে আসে মাঝে মাঝে। যদি ভালোবাসায় শরীর না থাকত তাহলে কত সুখী হতে পারতাম আমি আর নয়নাংশু!’ যদিও মালতী জানে অধিকাংশ নারীই সেটা করে। ভালো না বেসেও স্বামীকে দেহ দিয়ে মনকে অনুপস্থিত রাখে, সংসারের চৌকাঠে রক্তাক্ত হয় নারীর হৃদয়। তাই সাত সন্তানের জননী হয়েও নারী মনে মনে কুমারীই থেকে যায়। কেননা, জয়ন্তর মতো পুরুষের সংখ্যা জগতে সত্যিই খুব কম।

জয়ন্ত এক আকাশে বৃষ্টি নিয়ে মালতীকে দান করল পরিপূর্ণ স্বাদ। মালতী হয়ে উঠল আধুনিকতামুখী-জয়ন্তমুখী। জয়ন্তই তার জ্যোতির্মান। বাংলা উপন্যাসে এই বার্তা নতুন করে জাগিয়ে দিল নারীসত্তাকে। তবুও লক্ষণীয়-শরৎচন্দ্রের রাজলক্ষী বঙ্কুর মা হয়ে ফিরে যেতে পারেনি শ্রীকান্তের আহ্বানে। রবীন্দ্রনাথের কুমুদিনী মধুসূদনকে ত্যাগ করতে চেয়েও পারেনি-তার কারণও ছিল মাতৃত্বের আবিষ্কারের ইঙ্গিত। মালতী কি শুধু বুন্নির মা বলেই রয়ে গেল অপ্রেমের সংসারে নয়নাংশুর কাছে একই ছাদের নিচে! বোধহয় না। বোধহয় মাতৃত্বের চেয়েও সত্য হয়ে উঠল মালতীর জরায়ুর স্বাধীনতা। নতুন ভ্রুণের সঞ্চার নিয়ে রাত ভরে বৃষ্টিতে বুদ্ধদেব বসু আধুনিকতার জরায়ুকে প্রস্তুত করে দিলেন ভবিষ্যৎ মুক্তির যৌক্তিক আহ্বানে। এ পথেই ক্রম মুক্তি আসবে নারী স্বাধীনতার! অবিরল সেই বৃষ্টির শব্দ বাঙালি পাঠকের কানে আজও বাজে-ভবিষ্যতেও বাজবে। বুদ্ধদেব বসু সেই বৃষ্টির দেবতা।

মানবকণ্ঠ/মামুন রশীদ/স্বরলিপি

Leave a Reply

Your email address will not be published.