পাখি সুরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ একদল তরুণ

সকাল সকাল বন্ধুরা সব একত্রিত হয়ে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রত্যেকটি দলের ৮-১০ জন করে সদস্য ছড়িয়ে পড়ে উপজেলার আনাচে-কানাচে। তারা সবাই পাখিপ্রেমিক। পাখির প্রতি তাদের ভালোবাসা অপরিসীম। পাখি রক্ষায় সর্বস্তরের জনসাধারণকে সজাগ করার উদ্দেশে তারা বিভিন্ন স্লোগান সমৃদ্ধ লিফলেট বিতরণ ও আলোচনা সভা করে আসছেন। ‘এসো পাখির বন্ধু হই, সবুজ ও পৃথিবীকে বাঁচাই’- এ স্লোগানকে ধারণ করে নীলফামারীর সৈয়দপুরে গড়ে উঠছে সেতুবন্ধন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
পাখির নিরাপদ আবাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংগঠনটি ২০১৩ সাল থেকে সৈয়দপুর উপজেলা সদরসহ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কাজ করে যাচ্ছে। এই সংগঠনের তরুণরা পাখি রক্ষায় গাছে গাছে কলস বেঁধে দিয়েছে। আর এসব কলসে বাসা বেঁধেছে দোয়েল, বুলবুলি, ঘুঘুসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। তাদের লাগানো এসব কলসে পাখিরা দিয়েছে ডিম, ফুটিয়েছে ছানা। সংগঠনের সদস্যরা পড়াশোনার খরচ বাঁচিয়ে নিজেরা পকেটের টাকা খরচ করে এসব কলস ক্রয় করে থাকে। তারা এ পর্যন্ত উপজেলার প্রায় ৬ হাজার গাছে কলস বেঁধে দিয়েছে। এমনকি উপজেলাকে পাখি সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে তারা। পাখি শিকারকারীর বিরুদ্ধে নিয়েছে কঠোর অবস্থান। এলাকায় কেউ পাখি শিকার করছে এমন খবর তাদের কানে পৌঁছা মাত্রই সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পাখি শিকার রোধে কাজ করে চলেছে নিরলসভাবে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, হাটবাজারে প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট একদিন তারা এ কর্মসূচি চালিয়ে আসছে।
সরেজমিন নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের খালিশা বেলপুকুর গ্রামে কাশিরাম ইউনিয়নের বালাপাড়ায়, বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের মছে হাজীপাড়া থেকে চৌমুহনী, বাঙ্গালীপুর উচ্চ বিদ্যালয়, আবার শহরের ফাইলেরিয়া হাসপাতাল, খাদ্যগুদাম (সংরক্ষিত এলাকা) কয়ানিজপাড়া, মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়, থানা চত্বর, খানকাহ শরীফ, সৈয়দপুর কলেজ, সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতাল, সামাজিক বনায়নসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা মেলে তাদের লাগানো এসব কলস। বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা শতাধিক। শুধু সৈয়দপুরেই নয়, তাদের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলা, নীলফামারী সদর উপজেলার বড়ুয়া, দিনাজপুরের খানসামা, রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার গাছে গাছে পাখির বাসার জন্য মাটির কলস লাগানো হয়েছে।
সংগঠনের সভাপতি আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে এ কার্যক্রমে রইজ উদ্দিন রকি, নাফিজ, রফিকুল, টুইংকেল, নওশাদ আনছারী, ফাহিম, রনি, কাকন, জুয়েল, মাসুদ রানা, বিপু, সাকিব, রিফাত, আকাশ, জাহাঙ্গীর, আদিত্য আরাফাত, আনোয়ার সাহেব, আবু নাহিদ, শিমুল, আরিফ, কুতুবউদ্দিন আলো, বদরুদ্দোজা, জিএম কামরুল হাসান, মাহবুবুল আলম, রবিউলরা একত্রে হাতে হাত রেখে সেতুবন্ধনের মাধ্যমে তাদের পাখি বাঁচাও, প্রকৃতি বাঁচাও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সংগঠনের সভাপতি পাখি ও পাখির আবাসস্থল সংরক্ষণে ‘পাখি সংরক্ষণ সম্মাননা-২০১৬’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এ সম্মাননা প্রদানের আয়োজন করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের বন অধিদপ্তর। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে আলমগীর হোসেনসহ সারাদেশের ৯২ জনকে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সেতুবন্ধনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, ‘প্রকৃতিতে সজীবতা সৃষ্ট করা বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। এসব পাখি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। পাখি না থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া কৃষিতে পাখির ভূমিকা অপরিসীম। তারা ক্ষতিকর পোকামাকড় নিধনে ও চাষাবাদে বড় একটা ভূমিকা রাখছে।’
তিনি বলেন, ‘পশুপাখির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমরা মানুষকে সজাগ করার জন্য স্কুল, কলেজ, মাদরাসায় সভা-সমাবেশ, বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক, কৃষক মাঠ স্কুলে আলোচনা, সাইকেলে র‌্যালি, লিফলেট বিতরণ, গরিব ও অভাবীদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ, স্থানীয় পত্রিকায় পাখি সম্পর্কে কুইজ প্রতিযোগিতা, সচেতনামূলক নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছি।’
সংগঠনের সহ সাধারণ সম্পাদক খুরশিদ জামান কাঁকন বলেন, ‘পাখি বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে। আমরা যদি সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাই তাহলে আমরা সহজেই পাখি রক্ষায় সেতুবন্ধনের এ কার্যক্রম সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারব।’
এ প্রসঙ্গে সৈয়দপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হোমায়রা মণ্ডল বলেন, ‘এটি খুব ভালো ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ তাদের এবং সবার সহযোগিতায় পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদনে এই উদ্যোগ অদূর ভবিষ্যতে সুফল বয়ে আনবে।’

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.