জয়েই উদযাপন শততম টেস্ট

লোকে লোকারণ্য কলম্বোর পি সারা ওভাল। যেদিকে দৃষ্টি যায় শুধুই বাংলা ভাষার মানুষ। গত কয়েক দিন যেখানে হাতে গোনা মাত্র কিছু মানুষ ছিলেন। তপ্ত গরমে তারা অধিকাংশ সময়ই ছায়া খুঁজে খেলা দেখেছেন। প্রায় গোটা ম্যাচে বাংলাদেশ চালকের আসনে থাকলেও তপ্ত গরমের কারণে তাদের পক্ষে সেভাবে উল্লাস করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু কাল এত মানুষ কোথা থেকে এলো? আসলে লোকসংখ্যা খুব একটা বাড়েনি! রঙ্গনা হেরাথের ফুল টস বলে মিরাজ সুইপ করে স্কয়ার লেগে খেলেন। ফিল্ডারের হাত ফসকে বের হয়ে গেলে অপর প্রান্তে থাকা দলপতি মুশফিকুর রহিম ও মিরাজ মিলে ব্যাট উঁচিয়ে ব্যাঘ্র গর্জন করতে করতে ২ রান নেয়ার পরই নিশ্চিত হয়ে যায় শততম টেস্টে বাংলাদেশের জয়। জয় আসে চার উইকেটে। জয়টা মোটামুটি আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। বাকি ছিল আনুুষ্ঠানিকতা। সবাই অপেক্ষা করছিলেন জয়সূচক রানের জন্য। ব্যস। রান হওয়া মাত্রই মুশফিক-মিরাজের সঙ্গে ড্রেসিং রুম থেকে টাইগারদের ১০০ মিটার গতিতে দৌড়। কে কার আগে তুলে নেবেন স্মারক। কেউ স্মারক পেয়েছেন, কেউবা পাননি। কিন্তু তাদের গতির কাছে তখন হয়তো উসাইন বোল্টও হার মানতেন! এদিকে ক্রিকেটারদের জয়োৎসবের মাঝে গ্যালারিতে বসে থাকা মুষ্টিমেয় দর্শক যেখােেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী-শিশু-বালক-বালিকারা ছিলেন, তারা সবাই চিৎকার করে বাংলাদেশ বাংলাদেশ জয়ধ্বনি দিয়ে মুখরিত করে তোলেন। খেলা কভার করতে আসা বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও পেশাদারিত্ব ভুলে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। সবাই মিলে চলে অভিনন্দন, কোলাকুলি, আর সেলফি তোলার ধুম। গোটা পি সারা তখন বাংলাদেশিদের দখলে। স্বাধীনতার মাসে ক্রিকেটের কল্যাণে আরো একবার লাল-সবুজের পতাকা বিশ্ব ময়দানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল। জয়তু ক্রিকেট।
২০০০ সালে টেস্ট পরিবারের সদস্য হওয়ার পর ১৭ বছরের মাথায় শততম টেস্ট খেলতে নেমে বাংলাদেশ নিজেদের নিয়ে গেছে আরো উঁচুতে। যে পি সারা ওভাল ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য ‘কালো রাত্রি’, সেই পি সারা ওভালেই রচিত হলো নতুন ইতিহাস। যে ইতিহাসের নাম ‘শততম টেস্টে বাংলাদেশের জয়।’ যা ছিল আবার বাংলাদেশের নবম জয়। দেশের বাইরে ছিল চতুর্থ। টেস্ট পরিবারের সর্বশেষ সদস্য হিসেবে শততম টেস্ট খেলতে নেমে বাংলাদেশ যে ইতিহাস গড়েছে, তার ভূরি ভূরি উদাহরণ নেই। ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ড ১৯০৯ সালে প্রথম দেশ হিসেবে শততম টেস্ট খেলতে নেমে জয় পায়নি। কিন্তু এর পর অস্ট্রেলিয়া সে নজির গড়ে। বাংলাদেশকে নিয়ে যার সংখ্যা চার। মাঝে জয় পেয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তান। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে ধাবমান বাংলাদেশ এখন একদিনের ক্রিকেটের মতো নিজেদের ভিত মজবুত করে ফেলেছে। এই তো গত বছরই ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডকে ধরাশায়ী করেছিল। চট্টগ্রামে হারের পর ঢাকায় জিতে টেস্ট সিরিজ ড্র করেছিল। এবার শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও শততম টেস্টের জয় সিরিজ ড্র করেছে। সুখস্মৃতির গলেতে দুঃস্মৃতি রচনা করে হেরেছিল ২৫৯ রানে। মাঝে নিউজিল্যান্ড ও ভারতের কাছে হারলেও সেখানেও ছিল উত্তরণের ছাপ। শততম টেস্টে জয়ের আগে বাংলাদেশ শততম একদিনের ম্যাচেও জয় পেয়েছিল। ২০০৪ সালে ৪ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে তারা ভারতকে হারিয়েছিল। এ রকম নজির আবার টেস্ট ক্রিকেটের শততম টেস্টে জয় পাওয়া তিন দল অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানেরও আছে। তবে এখানে সামান্য পার্থক্য আছে। এই তিন দল আগে শততম টেস্টে জয় পেয়েছিল।
শততম টেস্টে জয় পেতে বাঘ-সিংহের লড়াই দারুণভাবে জমে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত বাঘের সঙ্গে পেরে ওঠেনি সিংহ। হারের আগে বেশ থাবা বসিয়েছিল। কিন্তু ব্যাঘ্র বাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠেনি। শততম টেস্টকে স্মরণীয় করে রাখতে মাত্র ১৯১ রানের টার্গেট। হেসে খেলেই জয় পাওয়ার কথা। উইকেটে যেখানে নেই আবার কোনো কিছুই। ছোট্ট এই টার্গেটেও বাংলাদেশকে বেশ কাবু করেছিল হেরাথ বাহিনী। উইকেট হারাতে হয়েছে ৬টি। প্রথম বাধাটা এসেছিল তাদের ব্যাটিং থেকে। লাকমাল ও দিলরুয়ানা মিলে দলের রানকে বাড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। এতে করে বাংলাদেশ উভয় সংকটে পড়েছিল। একদিকে রান বাড়ছে। অপর দিকে সময়ও কমে আসছে। মাটি কামড়ে পড়ে থাকা দিলরুয়ানকে কোনো বোলারই আউট করতে পারেনি। আগের দিনের ১২৬ বলে করা ২৬ রানের সঙ্গে ২৪ রান যোগ করে ৫০ রানে তিনি রান আউটের শিকার হন। অপরদিকে লাকমালও কম যাননি। ১৬ রানের সঙ্গে ২৬ রান যোগ করে তিনি ৪২ রানে সাকিবের শিকার যখন হন তখন দলের রান ৩১৯। এগিয়ে ১৯০ রানে। ১৩.২ ওভারে তারা ৫১ রান যোগ করে। বাংলাদেশের সামনে থাকে প্রায় আড়াই সেশন। ওভার ৭৪। উইকেটে টিকে থাকলে কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু সেই সহজ কাজটি বাংলাদেশ কঠিন করে ফেলে শুধু ব্যাটসম্যানদের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে। দলীয় ২২ রানে সৌম্য সরকার যেভাবে ডাউন দ্য উইকেটে মারতে হেরাথকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে ক্যাচ তুলে দেন তার কী কোনো ব্যাখ্যা আছে। পরের বলেই ইমরুল খোঁচা মারতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ। হেরাথ কি তা হলে জন্মদিনে হ্যাটট্রিক উপহার পাবেন! এ সময় প্রথম ইনিংসের সেই ২১ বলের ভুতুড়ে পরিবেশ চলে আসে। বলও ঘুরছিল। জয় কি তা হলে সোনার হরিণ হয়েই থাকবে! শততম টেস্টকে রঙে রঙে রঙিন করে তুলতে পারবে না বাংলাদেশ। ১৯১ রান তা হলে দূর আকাশের চাঁদ হয়েই থাকবে। ধরা যাবে না ছোঁয়াও যাবে না। সাব্বির এসে হেরাথের হ্যাটট্রিক ঠেকান। সেই সঙ্গে যেন নতুন করে বাংলাদেশের জয়ের রচনা লিখতে শুরু করেন। লাঞ্চের আগে যেখানে আরো উইকেট পড়ার শঙ্কা ছিল সেখানে সাব্বির তামিমের সঙ্গে জুটি বেঁধে তা প্রতিহত করেন। আর এই জুটিই বাংলাদেশের জয়কে সহজ করে তুলেছিল ১০৯ রান জমা করে। তামিম এগোচ্ছিলেন শতকের দিকে। কিন্তু তিনিও হঠাৎ করে ধৈর্যহারা হয়ে পড়েন। পেরেরাকে উইকেট ছেড়ে বের হয়ে মারতে গিয়ে ৮২ রানে চান্দিমালের হাতে ধরা পড়েন। তার এ রকমই একটি শট মিডিয়া বক্সের উপরে এসে পড়ে। কিন্তু তামিম আউট হওয়ার পরপরই সাব্বির ৪২ রানে এবং সাকিব দুর্ভাগ্যবশত বোল্ড হলে বাংলাদেশের জয় সহজ থেকে কঠিন হয়ে পড়ে। ২ উইকেটে ১৩৩ থেকে রান গিয়ে দাঁড়ায় ৫ উইকেটে ১৬২। তখনো জয় দূরে, ২৯ রানের। সে চাপ আরো বেড়ে যেত যদি ৫ রান পর মুশফিক রিভিউ নিয়ে না বেঁচে যেতেন। পেরেরার অফ স্টাম্পের বাইরে বল টার্ন করে ভেতরে ঢোকার মুহূর্তে তিনি প্যাড আপ করেন। শ্রীলঙ্কাদের আপিলে আম্পায়ার সাড়া দিলে মুশফিক রিভিউ নেবেন কি নেবেন না দ্বিধায় পড়ে যান। কারণ এটি ছিল শেষ রিভিউ। শেষ পর্যন্ত নিয়ে তিনি রক্ষা পেলে বাংলাদেশের জয় আবার ধীরে ধীরে কঠিন পথকে মসৃণ করে তোলে। জয় থেকে দুই রান দূরে থাকতে মোসাদ্দেক আউট হলেও মেহেদী এসে তার ব্যাট দিয়েই ইতিহাস লেখেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস