কার্গো ফ্লাইট নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ব্যাপক উদ্যোগ

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা ইস্যুতে চলতি (মার্চ) মাসের শেষ সপ্তাহে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিদর্শনে আসছে যুক্তরাজ্যের পরিবহন বিভাগের একটি দল। নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ২০১৬ সালের ৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন আলোচনা চলছে। আর তাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনে এ মাসেই আসছে যুক্তরাজ্যের পরিবহন বিভাগের একটি দল। তবে তারা কত তারিখে পরিদর্শনে আসবেন তার দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি।
অন্যদিকে এ পরিদর্শনকে সামনে রেখে বিমানবন্দরে বসানো হচ্ছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ যন্ত্র। এ ছাড়া যাত্রীদের লাগেজ ও যানবাহন তল্লাশি এবং তরল বিস্ফোরক শনাক্ত করতে আলাদা আলাদা যন্ত্রও বসানো হচ্ছে।
এসব বিষয়ের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ বিমানের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার শাকিল মেরাজ।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো ফ্লাইটের পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকেই বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য কাজ করা হচ্ছে। চলতি মাসেই (মার্চ) ইউরোপীয় একটি প্রতিনিধি দল বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক পরিদর্শনে আসছে। আর তাই যাত্রীদের লাগেজ ও যানবাহন তল্লাশি এবং তরল বিস্ফোরক শনাক্ত করতে আলাদা আলাদা যন্ত্র বসানো হচ্ছে।

এবার আমরা আশাবাদী উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা বলেন, আমরা নিরাপত্তার কোনো ইস্যুতে ছাড় দিচ্ছি না। আশা করছি প্রতিনিধি দল আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হয়ে কার্গো ফ্লাইটের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।
বিমান সূত্র জানায়, উড়োজাহাজের হোল্ডে রাখার মতো ভারি ব্যাগ তল্লাশির জন্য ৮টি ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন, হ্যান্ড ব্যাগ তল্লাশির জন্য ১৪টি ডুয়েল ভিউ স্ক্যানিং মেশিন, ৬টি লিকুইড এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (এলইডিএস), ৯টি আন্ডার ভেহিকল স্ক্যানিং সিস্টেম (ইউভিএসএস), ৪টি ফ্যাপ ব্যারিয়ার গেট উইথ কার্ড রিডার, ৫টি ব্যারিয়ার গেট উইথ আরএফআইডি কার্ড রিডার, ২টি এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস) এবং ৪টি এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেকশন (ইটিডি) কেনা হয়েছে। ব্যাগের ওপর ও দুই পাশ সব দিক দিয়েই স্ক্যান করতে সক্ষম ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন। অন্যদিকে, এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম দিয়ে ব্যাগ না খুলেই তল্লাশি করা যাবে।

এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক কাজী ইকবাল করিম বলেন, যে কয়টি ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন এসেছে, সেগুলো বসানোর কাজ চলছে। অন্য মেশিনগুলোর মধ্যে দুটির ব্যবহার শুরু হয়েছে ও দুটি সংযোজনের কাজ চলছে। সব মেশিন এখনো দেশে এসে পৌঁছায়নি।
কোন কোন জায়গায় এসব যন্ত্র বসানো হবে, তা ঠিক করতে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন হয়েছে। সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এসব যন্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেবে সরবরাহকারী ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান স্মিথস ডিটেকশন। বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালে পুরনো যন্ত্র সরিয়ে নতুন যন্ত্র সংযোজনের কাজ চলছে। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান রেডলাইনের পরামর্শে কেনা হয়েছে এসব যন্ত্র।
সিভিল এভিয়েশনের এক কর্মকর্তা জানান, এসব অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়ে খুব কম সময়ে যাত্রীদের তল্লাশি করা সম্ভব হবে। ফলে নিশ্চিত হবে নিরাপত্তা।
নিরাপত্তা ইস্যুতে যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনো ত্রুটি না পায় তাই আঁটঘাট বেঁধে কাজ করছে বাংলাদেশ বিমান। বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, অতিসত্বর যুক্তরাষ্ট্রে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার নিষেধাজ্ঞা দূর করার জন্য বিমান নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কার্গো হাউজের সর্বত্র লাগানো হয়েছে সিসিটিভি। হাউজের জনবলও বাড়ানো হয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে রেড লাইনের কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে বিমানকর্মীরা।
জানা গেছে, গত বছরের ৮ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বিশেষ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য জরুরি সরঞ্জাম সরবরাহ ও সংস্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয় ৮৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
বিমান সূত্রে আরো জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধে এরইমধ্যে আর্থিক ক্ষতি গুনতে হয়েছে বাংলাদেশ বিমানকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে বিমানের যেখানে আয় হয়েছিল ৩২৭ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা ১২ কোটি কমে হয়েছে ৩১৫ কোটি টাকা।
নিষেধাজ্ঞার ফলে শুধু যে বিমানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নয়। ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে দেশের পোশাক শিল্পকেও।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির সহ-সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, বাংলাদেশের পোশাক রফতানির বড় অংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। আমাদের অনেক সময় জরুরি ভিত্তিতে এয়ার শিপমেন্টে পণ্য রফতানি করতে হয়। সেক্ষেত্রে বিমানের কার্গো ফ্লাইট বন্ধ হওয়ায় আমাদের অন্যদেশ হয়ে পণ্য রফতানি করতে হচ্ছে। এতে খরচের পাশাপাশি বেড়েছে সময় ও ব্যয়।
বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, যুক্তরাজ্যের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হয়েছে। তার প্রত্যাশা, এবারের সফরে যুক্তরাজ্যের পরিবহন বিভাগ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুপারিশ করবে।
মন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছি। তারপরেও তাদের একটা টিম আসবে। তারা আবারো দেখবে। আশা করি এবার তারা ভালো অভিজ্ঞতা পাবে। নিশ্চয়ই তারা এটা তুলে নিতে সুপারিশ করবে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.