এক লাফে ব্যয় বাড়ছে সাতগুণ

মেয়াদ শেষ হয়েছে গত জুনে। এর পরও হলো না শেষ। বরং এবার এক লাফেই ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে সাতগুণ। কারণ ৪১০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো উন্নয়ন কাজ নয়, খোদ রাজধানীর ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন’ প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা। রাজউক বলছে, ব্রিজ নির্মাণ, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, হাঁটার রাস্তাও বেশি করে নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণেই ব্যয় হবে অধিকাংশ টাকা। তাই অপচয় ঠেকাতে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থাপনায় ভালো করে দেখভাল করা দরকার। ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্প প্রণয়ন বা প্রাক-সমীক্ষা না থাকায় এ দুরবস্থা বলে বিশেষজ্ঞের অভিমত। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।
সংশ্লিস্ট একাধিক সূত্র জানায়, ১৯৬১ সালে তদানীন্তন ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) গুলশান মডেল টাউন প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করে। একই সময়ে প্রায় এক হাজার একর জমি (বনানী-বারিধারা) আবাসিক ব্যবহারের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রমও শুরু হয়। ১৯৯২ সালে গুলশান মডেল টাউন এবং আংশিক বানানী ও বারিধারা আবাসিক কার্যক্রম এক হাজার একর ভূমি উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় শেষ হয়। তবে দুইশ’ একর এলাকাজুড়ে বিদ্যমান বনানী মডেল ও গুলশান মডেল টাউনের মধ্যে একটি লেক এবং গুলশান মডেল টাউন ও বারিধারা মডেল টাউনও রয়েছে। কিন্তু একটি লেকের উন্নয়ন কাজ আজ পর্যন্ত হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবৈধ দখল থেকে লেক পুনরুদ্ধার, লেকে পানি ধারণ ও সংরক্ষণক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয় রাজউক। ২০১০ সালের ৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক সভায় অনুমোদনও দেয়া হয়। তাতে ব্যয় ধরা হয় ৪১০ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাজউকের ব্যয় ধরা হয় ৯৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা, বাকি ৩১৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় ধরা হয়। আর বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত।
কাজও শুরু হয়। কিন্তু তিন বছর পরে প্রকল্পটি সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা হয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে। তাতে ব্যয় ধরা হয় ৬১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। সঙ্গে সময় বাড়ানোর কথাও বলা হয়। তাই পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদনও প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু তা অনুমোদিত হয়নি। পরে আবারো আবেদন করলে পরিকল্পনা কমিশন সার্বিক দিক বিবেচনা করে ব্যয় ছাড়া ২ বছর সময় বাড়িয়ে ২০১৬ সালের জুনে শেষ করার অনুমোদন দেয়। কিন্তু তাতেও হলো না শেষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের কাজ। আবারো ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন উপাদান যোগ করে সংশোধনের প্রস্তাব করে রাজউক। তাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। আর বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত।
সূত্র আরো জানায়, ঢাকা শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, লেক এলাকায় বিনোদনমূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা ও সংলগ্ন এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন এবং পানির গুণগত মান রক্ষা করার জন্য এবার প্রকল্পটি সংশোধন করা হচ্ছে। আগে ৮০ একর ভূমি অধিগ্রহণের কথা থাকলেও এবার ধরা হয়েছে ৮৩ একর। এ ছাড়া নতুন নতুন অঙ্গ যুক্ত করে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
সার্বিক ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে রাজউকের চেয়ারম্যান এম বজলুল করীম চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন প্রকল্পটি বিভিন্ন কারণে সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাই ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু ভূমি অধিগ্রহণেই অর্ধেক ব্যয় হবে। এ ছাড়া ৮টি ব্রিজ ও ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, কড়াইল বস্তি পুনর্বাসন, ওয়াটার ট্রিটমেন্টসহ বিভিন্ন কারণে ব্যয় বাড়ছে। তবে এখনো অনুমোদন পায়নি। পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। তিনি বলেন, আমরাও চাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। এতে সবাই উপকৃত হবেন।
এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ত্রুটিপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ত্রুটিযুক্ত প্রকল্প প্রণয়নই এর জন্য দায়ী। তারা কনসালটেন্ট ছাড়াই ওর নকশা করে প্রকল্পের কাজ শুরু করে। এরপর কনসালটেন্ট নিয়োগ হলে তারা পাবলিক হিয়ারিং বা গণশুনানির পর সামাজিক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু উপাদান যোগ করেছে। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণে যেহেতু অধিকাংশ ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে। তাই ভূমি কেনার ক্ষেত্রে অর্থাৎ প্রকৃত ভূমির মালিক কি না তা ভালো করে দেখভাল করার দরকার। তিনি আরো বলেন, ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণেই অর্থাৎ প্রাক-সমীক্ষা না থাকার কারণেই বার বার বাড়ছে সময়। ব্যয়ও বাড়ছে। তাই প্রকল্প প্রণয়নের আগে প্রাক-সমীক্ষা করা দরকার।
প্রকল্প প্রস্তাবে দেখা যায়, সংশোধিত প্রকল্পে নতুন করে ১৯টি অঙ্গ যুক্ত করা হয়েছে। মূল প্রকল্পে ৮০ দশমিক ১ একর জমি অধিগ্রহণের কথা ছিল। এখন সংশোধনীতে ৮৩ দশমিক শূন্য ৩ একর অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ৩১৪ কোটি ৬৩ লাখ ৮ হাজার টাকা ধরা হয়। এখন সেই ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ৮৮২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা হচ্ছে। অর্থাৎ নতুন করে অধিগ্রহণকৃত তিন একর জমির জন্য ব্যয় বাড়ছে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। মূল প্রস্তাবে ৯ লাখ ৫১ হাজার ৬৪৩ ঘনমিটার লেক খননে ব্যয় ধরা ছিল ৩৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। কিন্তু নতুন প্রস্তাবে ৯ লাখ ৭ হাজার ৬১১ ঘনমিটারের খনন ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। মূল প্রকল্পে ১২ হাজার ৭২৬ ঘনমিটার তীর সংরক্ষণের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এবারের প্রস্তাবে ১০ হাজার ঘনমিটার কাজ কমিয়ে ব্যয় কমছে মাত্র ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া মাটি ভরাট, পানির গুণগত মান রক্ষা এবং কড়াইল এলাকায় বস্তিবাসীদের জন্য একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া আটটি সেতু ও চারটি ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। থাকবে বাইসাইকেল লেন, বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পাবলিক টয়লেট, বোটিং সুবিধা ও ল্যান্ডিং স্টেশন। এর ফলে এটি প্রায় হাতিরঝিলের রূপ পাবে। এসব কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে।
এ ব্যাপারে গত বছরের ২৭ এপ্রিল একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
তাতে পরিকল্পনা কমিশন সার্বিক দিক বিবেচনা করে আপত্তি জানিয়ে বলে, সংশোধিত প্রকল্পটির কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি। যথাযথ সমীক্ষা ব্যতীত এবং বিভিন্ন কাজের পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত নকশা না করে নতুন করে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। কাজগুলো যথাযথভাবে করার জন্য তাই সমীক্ষা করতে বলা হয়। তা করা হলে এরপর বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে গত বুধবার পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয় পরিকল্পনা কমিশনে। সভায় প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়। বাকি কাজ শেষ করে খুব শিগগিরই একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।

মানবকণ্ঠ/জেডএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.