একই রাস্তায় দুই বিদ্যুৎ কোম্পানির দুই খুঁটি

একই রাস্তার দুই ধারে দুই বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির দুই খুঁটি। রাস্তার এক পাশে বিদ্যুতের লাইন বসানো আছে। তবু অন্য পাশে আরো একটি লাইন টানা হচ্ছে। অথবা এক খুঁটিতেই দুই প্রতিষ্ঠান দুটো লাইন টানছে। এক প্রতিষ্ঠান খুঁটির মাথায় তার টেনেছে। অন্যরা খুঁটির মাঝ বরাবর। একজন গ্রাহককে নিতে হচ্ছে দুই মিটার, দুই লাইন। সারাদেশেই এ ধরনের বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন আছে। কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে দুই লাইন স্থাপন করে চলেছে। এ ধরনের লাইনের কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। এ ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে বার বার গ্রাহকরা বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে ধর্ণা দিয়েও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। এই সমস্যা সমাধানে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে একটি কমিটি করা হলেও বিষয়টি সুরাহা হয়নি।
সূত্র জানায়, দেশের প্রায় ২৩টি জেলায় এভাবে ১১ হাজার ৯৫২ কিলোমিটার দ্বৈত লাইন স্থাপন করা হয়েছে। আরইবি দাবি করেছে, তাদের লাইন আছে অথচ সেখানে আবার পিডিবি বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন টেনেছে নয় হাজার ৮৪৮ কিলোমিটার। আর পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) স্থাপন করেছে দুই হাজার ১০৪ কিলোমিটার লাইন।
এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ আরইবি আর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতার কারণে। এতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ওজোপাডিকো। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও তা মানছে না পিডিবি বা ওজোপাডিকো। বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য বাংলাদেশে পাঁচটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি আছে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা ভৌগোলিক এলাকা নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। দেশের পল্লী অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে আরইবি। জেলা শহরগুলোতে পিডিবি। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহরগুলোতে দায়িত্বে রয়েছে ওজোপাডিকো। রাজধানীর দুই অংশে কাজ করছে ডিপিডিসি ও ডেসকো। কিন্তু মূল সমস্যা তৈরি করে রাখা হয়েছে আরইবি, পিডিবি ও ওজোপাডিকোর মধ্যে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কিছু লাইন পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) কাছে হস্তান্তর করার পরিকল্পনা করে সরকার। একইভাবে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ওজোপাডিকো) বিদ্যুতের লাইনের সমাধানের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু লাইন হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা না করেই ইচ্ছেমতো বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ফলে গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেক এলাকায় বিক্ষোভও করা হচ্ছে।
সম্প্রতি পিডিবির পটিয়া বিতরণ বিভাগের আওতাধীন পটিয়া, দোহাজারী ও সাতকানিয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহের লাইন আরইবির কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এ ঘটনায় গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হন। পরে বিক্ষোভ মিছিল করেন। একই ঘটনা ঘটেছে যশোর সদর উপজেলার ছয়টি গ্রামের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে। তাদের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় না নেয়ার দাবিতে রোববার সংবাদ সম্মেলন করেছেন। একই অবস্থা হয়েছে যশোর সদর উপজেলার ছয়টি গ্রামে এবং রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির গ্রাহকদের ক্ষেত্রে। তারা বর্তমানে ওজোপাডিকোর গ্রাহক। তাদের আরইবির কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন ওজোপাডিকোর গ্রাহকেরা। গ্রাহকরা জানান, যশোর শহরতলির শেখহাটি, বিরামপুর, পাগলাদাহ, নওদা গ্রাম, তরফ নওয়াপাড়া ও কিসমত নওয়াপাড়া এলাকায় ওজোপাডিকো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা বেশ ভালো। কিন্তু হঠাৎ করে আরইবি ওই এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি বসাতে শুরু করেছে। ফলে একই এলাকায় দুই ধরনের লাইন হচ্ছে। সরকার এসব এলাকার লাইন আরইবির কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিলেও এক্ষেত্রে গ্রাহকদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করা হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।
এ ঘটনা শুধু নির্দিষ্ট কিছু এলাকার নয়। দুই লাইন আছে এমন সব এলাকাই সমস্যা হচ্ছে। কেউ দুই বিতরণ কোম্পানির কাছ থেকেই বিদ্যুতের লাইন ও মিটার নিচ্ছেন আবার বিদ্যুৎ বিলও দিচ্ছেন। কেউ আবার নতুন সংযোগ নিতে গিয়ে বুঝতে পারছেন না কোন কোম্পানির লাইন নেবেন।
গত বছর এই সমস্যা খতিয়ে দেখতে এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সরেজমিন বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করেন। এ কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব মাকসুদা খানম বলেন, সমস্যা সমাধানে আমরা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছি। একটি প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। সমাধানের জন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোর মধ্যে আলোচনাও চলছে। কোথাও কোথাও সমাধান হলেও বেশিরভাগ জায়গায় নিজেদের জায়গা ছাড়তে চাইছে না কেউই। ফলে সমাধান করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, গ্রাহকদের ভোগান্তি কমানোর উদ্দেশ্যেই এ কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের যদি কোনো ভোগান্তি হয় তাহলে সেটি বিতরণ কোম্পানিকে জানাতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.