উত্তাপ বাড়ছে কুমিল্লায়

আজকের দিন শেষ হলে আর মাত্র ১০ দিন বাকি থাকবে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচনের। আর আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারণা শেষ হতে হাতে সময় আছে আর ৮ দিন। কিন্তু এরই মধ্যে নির্বাচনী উত্তাপ বেড়ে গেছে বহুগুন। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ আসতে শুরু করেছে। বিএনপি দলীয় কুসিকের অন্যতম মেয়র প্রার্থী ও সদ্য বিদায়ী মেয়র মনিরুল হক সাক্কু অভিযোগ করে বলেছেন, নির্বাচনে আমি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছি না। সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম সরকারী কর্মচারী হিসেবে নয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন সাচ্চা কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তার ভাবসাব দেখে মনে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকেও তিনি বড় আওয়ামী লীগার। অভিযোগ করার পরেও ইসি থেকে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখছি না।
অপরদিকে. কুসিক নির্বাচনে সাক্কুর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী ও কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ নেত্রী আঞ্জুম সুলতানা সীমা বলেছেন, প্রশাসনের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। তবে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। গতকাল রোববার সকালে এই প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই কথা বলেন কুসিক নির্বাচনের মেয়র পদে অন্যতম দুই প্রভাবশালী প্রার্থী।
জানা যায়, আসন্ন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দুই মেয়র প্রার্থীর জন্যই নগরীর দক্ষিণের ৯টি ওয়ার্ডের সাড়ে ৬০ হাজার ভোট নানাবিধ কারণে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। দুই প্রার্থীই মনে করেন, তাদের মেয়র হতে হলে সদর দক্ষিণ উপজেলার এই ৯টি ওয়ার্ডে ভালো করতে হবে। তাই তাদের পুরো মনোযোগ এখন সদর দক্ষিণের এই ৯টি ওয়ার্ড ঘিরে। সাধারণের ধারণা. এখানে যে লিড নেবেন সেই ফলাফলে ভালো করবেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই নির্বাচনী উত্তাপটা শুরু হয়েছে প্রথম এই ৯টি ওয়ার্ড কেন্দ্র করেই।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বিএনপিদলীয় প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা মনিরুল হক সাক্কু বলেন, নির্বাচনের এত দিন প্রশাসন মোটামুটি ভালোই ছিল। কিন্তু আজ কয়েকদিন ধরে সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম দক্ষিণের ৯টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি আমার নেতাকর্মীদের হুমকি ধমকি দিচ্ছেন যাতে তারা গণসংযোগ না করে এবং নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েক সক্রিয় কর্মীকে গ্রেফতার করে অন্য কর্মীদের জানিয়ে দেয়া হচ্ছে, তোমরা যদি ধানের শীষের পক্ষে কাজ কর, তাহলে তোমাদেরও একই অবস্থা হবে। আমরা যাদের এজেন্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি দক্ষিণের ওসি ও তার লোকজন তাদের বাড়িঘরে খবর পাঠিয়ে আমাদের কর্মীদের এজেন্ট না হওয়ার জন্য বলছেন। তিনি বলেন, ১৮ মার্চ শনিবার আমি তিনজন নির্বাচন কমিশনারের উপস্থিতিতে এই পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছি। এমনকি রিটার্নিং অফিসারকে লিখিতভাবেও জানিয়েছি। তার পরেও অদৃশ্য কারণে সদর দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে এখনো শুনিনি। নির্বাচনে যদি আমি প্রচার-প্রচারণার সমান সুযোগ না পাই, আমার নেতাকর্মীদের যদি হুমকি ধমকি দিয়ে দূরে পাঠিয়ে দেয়, যদি এজেন্ট দিতে সমস্যা সৃষ্টি করে তাহলে আমি নির্বাচনে কিভাবে সমান সুযোগ পেলাম। সুষ্ঠু এবং অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে বিএনপিদলীয় প্রার্থী দ্রুত সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানান। তিনি আরো বলেন, ‘ইসি ও রিটার্নিং অফিসার কঠোর অবস্থান না নিলে নির্বাচন শেষ পর্যন্ত সুন্দর হবে না। আমরা চাই ভোটাররা প্রত্যেকে নির্ভয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাক।
আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমার অভিযোগকে একেবারেই ভিত্তিহীন বলে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা যদি ১০-১২টি গাড়ি দিয়ে গণসংযোগ করি আর আমার সঙ্গে যদি মামলার আসামিরা থাকে তাহলে অভিযোগ না দিয়ে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে প্রমাণ করুক, তিনি সত্য কথা বলেছেন।
বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাক্কুর প্রধান নির্বাচনী সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মো. কাইমুল হক রিংকু বলেন, ‘সদর দক্ষিণের ওসি নজরুল ইসলামের আচরণ দলীয় কর্মীদের থেকেও ভয়ঙ্কর। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে তিনি প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছেন।’ তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ডিবি পরিচয়ে আমাদের কর্মী-সমর্থকদের নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেয়া হচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সন্ধ্যা হয়ে গেছে; যার যার মতো বাসায় ফিরে যান।’
এদিকে, বিএনপির প্রার্থীর একাধিক কর্মী-সমর্থকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্ধ্যার পর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা বন্ধ করে দিচ্ছেন কিছু ব্যক্তি। এমনকি কুমিল্লা দক্ষিণের ওসি নজরুল ইসলাম তাদের মেয়র প্রার্থীকে নির্বাচনী অফিস করতেও বাধা দিচ্ছেন। পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণায়ও বাধা দেয়া হচ্ছে অভিযোগ করে তারা জানান, আওয়ামী লীগ সমাবেশ করলেও তাদের বাধা দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু বিএনপিকে পথসভা করতেও দেয়া হচ্ছে না।
ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা বিএনপিদলীয় প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুর এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। যাদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা ছিল এবং দীর্ঘদিন সে এলাকার বাইরে ছিল এখন নির্বাচন উপলক্ষে এলাকায় এসে নির্বাচন করছে এমন আসামিদের গ্রেফতার করা তো আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমি সততার সঙ্গে আমার নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র। আর অন্য সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন সদর দক্ষিণ থানার পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন বলেন, এ ব্যাপারে বিএনপির প্রার্থী আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেনি। যদি তিনি অভিযোগ করেন তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা বলেন, প্রশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। যতটুকু দেখছি, প্রশাসন উভয় দলকেই সমান সুযোগ দিচ্ছে। আর সদর দক্ষিণ থানার অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বলেন, এটা আমার বিষয় নয়। তবে এতটুকু জানি, যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে পুলিশ তাদেরই গ্রেফতার করছে। এখন মামলার আসামি যদি প্রকাশ্য ঘুরে বেড়ায় আর পুলিশ যদি তাদের গ্রেফতার না করে তাহলে এটি কি আইন লঙ্ঘন হবে না? আঞ্জুম সুলতানা সীমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু আর তার স্ত্রী প্রতিনিয়ত আচরণবিধি লঙ্ঘন করে গণসংযোগ করছেন এবং প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির প্রার্থীর স্ত্রী টিকলী বেগম যেদিকেই যাচ্ছেন তার সঙ্গে ১০-১২টি গাড়ির বহর থাকছে। একই কাজ করছেন সাক্কু সাহেবও। যা নির্বাচনী আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমি রিটার্নিং অফিসার ও কুমিল্লার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে অনুরোধ জানিয়ে বলব, বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে সব সময় ১০-১০ এর মামলার আসামি ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা থাকছে। যারা সেদিন কুমিল্লা শহরে প্রকাশ্য অস্ত্র প্রদর্শন করেছিল। যা জাতীয় এবং স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তাদের ব্যাপারে দৃষ্টি দেয়ার জন্য। আমার কাছে খবর আছে বিএনপি প্রার্থী প্রচুর অস্ত্র এনেছে। সুতরাং সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এই অস্ত্রবাজদের গ্রেফতার করতে হবে।
আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমার নির্বাচনী সমন্বয়কারী ও কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা নূর-উর-রহমান মাহমুদ তানিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মডেলে কুমিল্লা সিটি নির্বাচন করতে চায়। দলীয় প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের পক্ষ থেকে আমাদের এমন বার্তাই দেয়া হয়েছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তৃণমূল পর্যন্ত অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। নেতৃত্ব পর্যায়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও তৃণমূলে এর প্রভাব পড়বে না।’ বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, তা সঠিক নয়। মিথ্যা ও বানোয়াট গল্প মাত্র।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও কুমিল্লা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডল বলেন, বিএনপিদলীয় প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুর অভিযোগ পেয়েছি। সবে মাত্র অফিস টাইম হয়েছে (রোববার, দুপুর ১২টা) ২ ঘণ্টা হলো। তিনি অভিযোগ করেছেন গতকাল (শনিবার)। আমরা অফিস করছি। দেখছি কি করা যায়। কোনো খবর হলে আপনাদের জানাব। তিনি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আসন্ন কুসিক নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আমাদের পক্ষ থেকে যা যা করা দরকার আমরা সব কিছুই করব। শনিবার আমাদের তিন জন নির্বাচন কমিশনার মহোদয় বলেছেন, নির্বাচনে কোনো বাহিনীর শৈথল্য বরদাশত করা হবে না। আমরা সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। কথা দিচ্ছি, ৩০ মার্চ কুমিল্লায় অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আবারো জোর দিয়ে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে কমিশন বদ্ধপরিকর। নির্বাচন কর্মকর্তারা কয়েকটি ওয়ার্ড ঘুরেছেন। সেখানে তারা বড় ধরনের আচরণবিধি ভঙ্গ দেখতে পায়নি। টিমের সঙ্গে পুলিশের তিনটি গাড়িও ছিল। কোথাও কোনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি। ভোটাররা যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারেন, আমরা সেই বিষয়ে সচেষ্ট আছি। নির্বাচনে কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এদিকে দিন যতই যাচ্ছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার উত্তাপ ততই ছড়াতে শুরু করেছে নগর কুমিল্লায়। এরই মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করছেন এবং তারা গণসংযোগও করছেন।

মানবকণ্ঠ/এসএস