আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা যাচাই জরুরি

গত ১৬ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই পরেরদিন আবারও তারা সংবাদের শিরোনাম হলো রাজধানীর আশকোনায় প্রস্তাবিত র?্যাব সদর দফতরের অস্থায়ী ব্যারাকে আত্মঘাতী বোমা হামলার মধ্য দিয়ে। এটি এমন একটি ঘটনা যার মধ্য দিয়ে তারা নিজ উদ্যোগে তাদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার একটি পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে হয়। এই হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আইএসের পক্ষ থেকে তাদের সংবাদ মাধ্যম ‘আমাক’ এ দায় স্বীকার করা হয়েছে। বিষয়টিকে আগের দিনের সীতাকুণ্ডের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযান পরবর্তী জঙ্গিদের পক্ষ থেকে এক তাৎক্ষণিক জবাব হিসেবে মনে করা যেতে পারে। সে সঙ্গে এটিকে এমন একটি বার্তা হিসেবেও তাদের পক্ষ থেকে দেখা যেতে পারে যে, যখন কোনো জঙ্গি আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়া সম্ভব। আশকোনার হামলার ধরন দেখে না বোঝার কোনো কারণ নেই যে তারা অনেক ভেবে-চিন্তেই এমন হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আত্মঘাতী জঙ্গিরা এক্ষেত্রে কতটুকু সচেতন তা তার কোমরে বাঁধা বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর মধ্য দিয়েই অনুমান করা যায়। সে যদি র?্যাবের হাতে ধরা পরে যেত তবে তার কাছ থেকে অনেক তথ্য আদায় করে তাদের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হবে এমন শংকার কথা চিন্তা করে সদর দফতরের সীমানা প্রাচীর অতিক্রম করার পর তাকে চ্যালেঞ্জ করার পর পরই সে বিস্ফোরণ ঘটায়। অবশ্য তার হয়তো উদ্দেশ্য ছিল তার জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সেখানে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করার, যা সম্ভব হয়নি সেখানে উপস্থিত র?্যাব সদস্যবের হাতে ধরে পরে যাওয়ার কারণে। আগের দিন সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে শিশুসহ ৫ জঙ্গি নিহত হয়। এর আগের দিন একটি জাতীয় পত্রিকায় দেখছিলাম বাংলাদেশের একজন আত্মঘাতী আইএস জঙ্গির ছবি এবং পরেরদিন তার পরিচয় থেকে জানা যায় সে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাসিন্দা নিয়াজ মোর্শেদ, সে উচ্চ শিক্ষিত এবং গত দুই বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না তার। পরে আইএস-এর পক্ষে কোনো এক অভিযান চালাতে গিয়ে সে নিহত হয়। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া পুলিশ প্রধানদের এক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ রোহান গুনারতেœ অত্যন্ত জোড় দিয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে গত বছর সংগঠিত হামলার জন্য আইএসকে দায়ী করে মন্তব্যের পর খোদ পুলিশ প্রধান এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আবারও এ ধরনের দাবি নাকচ করে দিয়ে জানান যে, দেশের অভ্যন্তরীণ জঙ্গিগোষ্ঠীই এ ধরনের হামলাগুলো ঘটিয়ে চলছে। তবে যদ্দুর মনে করতে পারছি, এর আগে হলি আর্টিজানের হামলার পর পুলিশের কোনো একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা মন্তব্য করেছিলেন যে, এসব হোমগ্রোন জঙ্গিদের সঙ্গে আইএসের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে এবং এর পরপরই নব্য জেএমবির নেতৃত্বে থাকা তামিম চৌধুরীর নাম বেড়িয়ে আসে এবং পরবর্তিতে নারায়ণগঞ্জে পুলিশ অভিযানে সেও নিহত হয়। সদ্য শেষ হওয়া ঢাকায় তিনদিনব্যাপী পুলিশ প্রধানদের সম্মেলনে বারবার করেই এসেছে বৈশ্বিক জঙ্গি হামলার বিষয় এবং সবকিছু ছাপিয়ে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা এবং এর পেছনে দেশের ভেতর জেএমবি বা অন্য কোনো গোষ্ঠী নয়, আইএস জড়িত বলে রীতিমতো বড় ধরনের বোমা ফাটিয়েছেন শ্রীলঙ্কার জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ রোহান গুনারতেœ। যদিও তিনি এর স্বপক্ষে কোনো তথ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেননি তারপরও এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনার রেশ থাকতে থাকতেই ১৬ এবং ১৭ মার্চ তারিখে যথাক্রমে সীতাকুণ্ড এবং রাজধানীর আশকোনায় বোমা হামলার মাধ্যমে জঙ্গিরা কি রোহান গুনারতেœর কথাকেই প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায়ে এমন চেষ্টা করছেন কি না সেটা ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। পুলিশপ্রধানদের সম্মেলনের দ্বিতীয়দিনে পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেছেন, ‘হোম গ্রোন’ জঙ্গিদের সঙ্গে আইএসের ভার্চ্যুয়াল ওয়ার্ল্ডে যোগাযোগ থাকতে পারে। তবে দেশীয় জঙ্গিদের আইএস-অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়া বা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এখন কথা হচ্ছে তামিম চৌধুরী যদি কনাডায় থেকে এবং সেদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করার পরও জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে এবং সম্প্রতি সংবাদে আসা নিয়াজ মোর্শেদের মতো জঙ্গিরা যদি এদেশ থেকে গিয়ে আইএসের পক্ষে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতে পারে এবং ইতোপূর্বে বিভিন্ন সময়ে সংবাদে আসা অনেক জঙ্গিদের বিষয়ে এমনটাও জানা গিয়েছিল যে তারা এদেশ থেকে গিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছে এবং তাদের ঘনঘন দেশে যাওয়া আসা ছিল, তবে আমরা কোনো কারণে এদেশে এ ধরনের ঘটনাগুলোর জন্য আইএসকে দায়মুক্তি দেব? সীতাকুণ্ডের ঘটনা আমাদের মনে নতুন করে আতঙ্কের জš§ দিয়েছে এ কারণে যে, এর আগে নিকট অতীতে চট্টগ্রামে কোনো জঙ্গি আস্তানার সন্ধান খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কোনো জঙ্গি হামলার ঘটনাও ঘটেনি। ধারণা করা গিয়েছিল যে এই অঞ্চলে অনেক মাদ্রাসা এবং ইসলামী সংগঠনের অস্তিত্ব থাকার কারণে নিছক ধর্মকে পুঁজি করে জঙ্গি কার্যক্রম প্রসারের সুযোগ এখানে সীমিত। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে এমন ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গে একটা পুরনো বার্তা নতুন করে সবার সামনে চলে আসল যে এদেশের সর্বত্রই জঙ্গিরা বিচ্ছিন্ন অথচ সংগঠিত উপায়ে ছড়িয়ে আছে। তবে এখানে একটি বিষয়ের উল্লেখ করতেই হয় আর তা হচ্ছে সাম্প্রতিককালে জঙ্গি হামলাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সীতাকুণ্ডের ঘটনায় সেখানকার পৌর এলাকার একজন বাড়ির মালিকের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় পুলিশ। ১৫ মার্চ দুপুরে আমিরাবাদ এলাকার বাড়ির মালিক তার ভাড়াটিয়া জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন সন্দেহে পুলিশকে ডেকে আনলে পুলিশ বাড়ির নিচতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে গ্রেনেড, আত্মঘাতী হামলা পরিচালনার জন্য সুইসাইড ভেস্ট, পিস্তল, বুলেট এবং বোমা তৈরির ব্যাপক সরঞ্জামসহ ভাড়াটিয়া দম্পতিকে আটকের পর তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তিতে প্রেমতলা চৌধুরীপাড়া এলাকায় ছায়ানীড় নামক বাড়িতে অভিযান চালায়। একদিকে এলাকাবাসীর এমন সহযোগিতা যেমন প্রশংসার দাবিদার, এর উল্টোচিত্র হচ্ছে এমন তথ্যদাতার নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ কিভাবে দেখছে তা স্পষ্ট না হওয়ার কারণে সবাই যে এভাবে তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করতে চাইবে এমনও আশা করা যায় না। তার উপর এখানে আরো একটি ভাবনার বিষয় হচ্ছে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো তাদের উপর সাম্প্র্রতিককালে পরিচালিত অভিযানগুলোর মাধ্যমে আপাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও প্রতিটি অভিযানের মাধ্যমে যে বিষয়টি বারবার সামনে চলে আসছে তা হচ্ছে তাদের মধ্যকার সমন্বয়ের বিষয়টি সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যে বিষয়টি আমাদের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে এখনো অনেক অভাব, আর একারণেই সম্ভবত অনেক অভিযান পরিচালনা করেও তাদের বিস্তার রোধে তেমন সফলতা পাওয়া যাচ্ছে না। জঙ্গি গোষ্ঠীর নতুন করে এহেন কর্মকাণ্ড এবং এর সঙ্গে আইএসের সম্পৃক্ততার যে দাবি করা হচ্ছে তাকে পুলিশ প্রশাসন যতই ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করুক না কেন, কেবলমাত্র হোমগ্রোন জঙ্গিদের মাধ্যমে এমন পরিকল্পিতভাবে তাদের সংগঠিত হওয়া সম্ভব নয়
উপরন্তু এমনটাও ধারণা করা যেতে পারে যে আইএসের শক্তিকে খাটো করে দেখার সরকারি প্রচেষ্টাকে তারা খুব একটা ভালোভাবে নিতে পারছে না। এর চাইতেও বড় সত্য হচ্ছে এ ধরনের ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্নভাবেই কোনো কোনো দেশে ঘটছে না, বরং বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিটি ঘটনার মধ্যে একধরনের অদ্ভুত যোগসূত্র রয়েছে। তাদের সংগঠিত হওয়ার জন্য যে ধরনের প্রশিক্ষণ, অর্থ এবং অস্ত্রের প্রয়োজন, সেগুলোর সংস্থান করাও কেবল হোমগ্রোন জঙ্গিদের মাধ্যমে সম্ভব নয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনের লক্ষ্যে আয়োজিত সম্মেলনে ১৪টি দেশের পুলিশপ্রধান ছাড়াও পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা (ইন্টারপোল), ফেসবুক প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই), আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে জঙ্গিবাদবিষয়ক যে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছেন ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পাশাপাশি এমন উদ্যোগকে আরো বৃহত্তর ক্যানভাসে নিয়ে আসতে হবে। জঙ্গিবাদের মাধ্যমে আজ রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বকে হীন করার যে অপচেষ্টা নেয়া হচ্ছে তা এককভাবে কেবলমাত্র আক্রান্ত রাষ্ট্রের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নিরাময় হবে- এমন ধারণা যদি করা হয় তবে তা হবে মারাত্মক ভুল। সেজন্য বৈশ্বিক পরিসরে অভিন্ন কর্মপন্থা নিয়ে যদি এগুনো না যায় তবে দুঃখজনক হলেও যে কথা বলতে হয় তা হচ্ছে এসব ঘটতেই থাকবে। আজ পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর হামলার কেবল একটি মহড়া হয়েছে, যা আশকোনার ঘটনা থেকে অনুমান করা যায়। আগামীতে যদি আরও বৃহত্তর পরিসরে জঙ্গিদের পক্ষ থেকে হামলার উদ্যোগ নেয়া হয়, তবে তা প্রতিরোধে আমাদের বাহিনীগুলো কতটুকু সক্ষম তা যাচাই করে দেখার এখনই প্রকৃত সময়।
লেখক: শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং
দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published.