আইএসের তকমা দিতে আবারো গভীর ষড়যন্ত্র

আবারো কথিত আইএসের (ইসলামিক স্টেট) দায় স্বীকার নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই দায় স্বীকারের বার্তার অস্তিত্ব নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। নেপথ্যে দেশীয় একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের আইটি শাখার সদস্যের জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেশের বাইরে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্ন বার্তা এরাই পাঠিয়ে থাকে। পশ্চিমাগোষ্ঠীর কাছে তারা তথ্য পাঠিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। পুলিশের দুটি ইউনিট এদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারে কাজ করছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গোয়েন্দারা মনে করছেন, বাংলাদেশকে আইএস তকমা দিতেই পশ্চিমাগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে। তারা স্থিতিশীল পরিবেশকে অস্থির করে তুলতে নানা ধরনের ছক কষছে। ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেল্লা খুনের পর বিভিন্ন দেশের পক্ষে যেভাবে কথিত সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল সে ধরনের কূটকৌশল চালিয়ে যাচ্ছে। তারা নানাভাবে আইএসের উৎস তৈরি করতেও উসকানি দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে কোনো আইএস নেই। তবে বিচ্ছিন্নভাবে তাদের ‘ভার্চুয়াল সমর্থক’ থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গুলশানে ইতালীয় নাগরিক তাভেল্লা সিজার খুনের মধ্য দিয়ে কথিত আইএসের দায় স্বীকারের বার্তা শুরু হয়। সর্বশেষ রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাব ক্যাম্পে হামলার মাধ্যমে আইএসের পক্ষে কথিত দায় স্বীকার করা হয়েছে। এসব বার্তার নেপথ্যে সরকারবিরোধী শক্তির হাত রয়েছে। যাদের মাধ্যমে দেশের যে কোনো ঘটনা সম্পর্কে গোপন বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশে। ঢাকার যে কোনো ধরনের বার্তা প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাই ও পরে সেখান থেকে মার্কিন সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের কাছে পাঠানো হয়। তারপরই আইএসের নামে দায় স্বীকার করে বার্তা দেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম মানবকণ্ঠকে বলেন, সরকারের যারা ভালো চায় না তারাই জঙ্গিবাদকে উসকে দিচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের আইটি শাখার সদস্যরা দেশের বাইরে ঢাকার নিয়মিত বার্তা পাঠিয়ে থাকে। কথিত আইএসের দায় স্বীকারের নেপথ্যেও তারাই জড়িত। বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করতে বিশেষ গোষ্ঠীর সঙ্গে তারা হাত মিলিয়েছে। এতে করে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা হামলায় সরাসরি লোক দিচ্ছে। এরা তাদের দলের প্রশিক্ষিত সদস্য। এ ছাড়া দায় স্বীকারের বার্তা এবং হামলার ঘটনাগুলো একই সূত্রে গাঁথা।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলটি বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দায় স্বীকারের বিবৃতি প্রচারের ব্যবস্থা করে। দেশের ভেতরে তাদের আইটি শাখার লোকজন বিদেশে মেইল বা বিশেষ অ্যাপসে বার্তা প্রেরণ করে। সেই বার্তা পৌঁছার পরপরই বাংলাদেশে আইএস আছে বলে তকমা দিতে বিবৃতি ছড়ানো হয়। কিন্তু গোয়েন্দারা তাদের প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে এসব জানতে সক্ষম হয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে, দায় স্বীকারের রহস্যের নেপথ্যে যারা কাজ করছেন তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার সম্ভব হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে নানা ধরনের তৎপরতা চালিয়ে আসছে দেশি-বিদেশি চক্র। তারই অংশ হিসেবে পরিকল্পিতভাবে বিদেশি হত্যা, পুলিশ হত্যা, শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, খ্রিস্টান যাজকদের ওপর হামলা ও হুমকিগুলো ঘটে। গুলশান ও শোলাকিয়া হামলা ছাড়াও এর আগে বিচ্ছিন্নভাবে সব চোরাগোপ্তা হামলার পরপরই হামলার জন্য আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয়। তখন থেকেই বাংলাদেশে আইএস সক্রিয় বলে প্রচার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত মহল। কোনো সন্ত্রাসী ঘটনার পর আইএসের দায়ের কথা উল্লেখ করে সন্ত্রাস দমনে সহায়তা দিতে ইচ্ছুক বলেও বিবৃতি দেয়া হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আইএসের উপস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র বানিয়ে অকার্যকর করার চেষ্টার অংশ হিসেবে র‌্যাব ক্যাম্পের হামলার দায় কথিত আইএস স্বীকার করে। তবে এসব কিছু গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, পৃথিবীর যেসব দেশে আইএস সৃষ্টি হয়েছে এর পেছনে পশ্চিমা বিশ্বশক্তির হাত আছে বলেও বিভিন্ন কারণে প্রমাণিত। এই পশ্চিমারা ‘হাকিম হয়ে হুকুম করে, ওঝা হয়ে ঝাড়ে’। আইএস দমনের নামে তাদের দ্বিমুখী চরিত্রও ধরা পড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তারাই কয়েক দশক ধরে আইএস সৃষ্টি করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ করেছে। আর এখন তারা এশিয়াতেও ঢুকতে তৎপরতা চালাচ্ছে। কারণ যেখানে তাদের ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের স্বার্থ আছে সেখানেই তারা আইএসের তকমা দিতে ষড়যন্ত্র করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো লাভ হবে না। এ দেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দায় স্বীকার করে বার্তা দেয়ার সিদ্ধান্ত জঙ্গিদের আরো চার বছর আগের নেয়া। ২০১৩ সালে গ্রেফতার কয়েক জঙ্গির কাছ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য মেলে। দেশীয় জঙ্গিরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে হামলা ও নাশকতার পরিকল্পনা করে। এর মধ্যে রিবাত (গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি) নামে আক্রমণের পরিকল্পনা করে। সে অনুযায়ী বিভিন্ন স্থাপনা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। তাদের ভাষায় ‘সশস্ত্র জিহাদি হামলা’। পরে ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দায় স্বীকার করা। এর পেছনে ওই রাজনৈতিক দলের আইটি শাখার সদস্যদের জড়িত থাকার তথ্যের বিষয়টি গোয়েন্দাদের কাছে ধরা পড়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, হামলা বা নাশকতাকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে আইএস তকমা দিকে ষড়যন্ত্র শুরু করে, যা এখনো অব্যাহত আছে। এসব সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত হাতে কৌশলে প্রতিহত করে যাচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

One Response to "আইএসের তকমা দিতে আবারো গভীর ষড়যন্ত্র"

  1. Pingback: নির্বাচিত হেডলাইন - ২০ মার্চ ২০১৭ ⋆ সাম্প্রতিক ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published.